বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে ভাষণ

ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান প্রেসিডেন্টের

Printed Edition
onno-1
মাসুদ পেজেশকিয়ান।

আলজাজিরা

বহিরাগত হুমকির মুখে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তেহরানে দেশটির বিপ্লব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৪৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল জনসমাবেশে দেয়া ভাষণে এই আহ্বান জানান তিনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার সরকার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।

সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতে রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিপুল জনসমাগম হয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের এই বার্ষিকী এমন এক সময়ে পালিত হলো, যখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে দেশটি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সর্বশেষ দফার আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন আবারো। ওয়াশিংটনের দাবি, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি- বিভিন্ন বিষয়ে ইরানকে ছাড় দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নেতা অঞ্চলটিতে আরো একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর কথাও বিবেচনা করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির পাশাপাশি ইরান তীব্র অভ্যন্তরীণ বিভাজনেরও মুখে। চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হন। একই সাথে দেশটির অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। তেহরানের আজাদি স্কয়ারে সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে পেজেশকিয়ান ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের’ মুখে ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে আছি... আমাদের জাতিকে লক্ষ্য করে যে সব ষড়যন্ত্র চলছে, তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ।’ তিনি আরো বলেন, ইরানি জনগণের শক্তি ও ঐক্য ‘আমাদের শত্রুর মনে উদ্বেগ তৈরি করে।’ তার ভাষায়, ‘আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।’

পারমাণবিক আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরান ‘পারমাণবিক অস্ত্র চাইছে না’ এবং ‘যেকোনো ধরনের যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত।’ তবে তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যে ‘অবিশ্বাসের উঁচু দেয়াল’ তৈরি করেছে, তা আলোচনাকে ফলাফলে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, ‘একই সময়ে আমরা পূর্ণ দৃঢ়তা নিয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে শান্তি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে সংলাপে যুক্ত আছি।’

সাম্প্রতিক বিক্ষোভ প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও মুদ্রার দরপতন ঘিরে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, পরে তা সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে বিস্তৃত হয়। তিনি সরকারের সীমাবদ্ধতার জন্য ক্ষমা চান এবং বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানে ‘সম্ভব সব রকমের চেষ্টা’ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের কথা শুনতে প্রস্তুত। আমরা জনগণের সেবক। আমরা জনগণের সাথে সঙ্ঘাতে যেতে চাই না।’ তিনি দাবি করেন, ইরানের শত্রুরা ‘বাজে প্রচারণা’ চালিয়ে অস্থিরতা উসকে দিয়েছে। তিনি এসব বিক্ষোভকে দাঙ্গা বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘আমাদের শত্রুরা সমাজে গভীর ক্ষত তৈরি করতে এবং বিভাজন বাড়াতে যে চেষ্টা করছে, আমাদের সেই ক্ষত সারিয়ে তুলতে হবে।’

তেহরান থেকে আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলি আকবর দারেইনি বলেন, পেজেশকিয়ানের ভাষণ থেকে বোঝা যায় ইরান ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির জন্য উন্মুক্ত।’ তিনি বলেন, বিস্তারিত কিছু না বললেও এ থেকে স্পষ্ট, ইরান একদিকে আলোচনায় প্রস্তুত, অন্যদিকে এমন অবাস্তব দাবি প্রতিহত করবে, যা ইরানকে নিরস্ত্র করতে চায় বা তার সার্বভৌম অধিকার অস্বীকার করে। দারেইনি বলেন, পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে জনগণের ক্ষোভকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার সমস্যাগুলো সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

তেহরান থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক রসুল সরদার জানান, এই বার্ষিকী উদযাপন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হচ্ছে, যখন ইরান একদিকে বহিরাগত হুমকি, অন্যদিকে গভীর অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মুখে। তিনি বলেন, ‘পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক দাবি রয়েছে।’ একই সাথে তিনি যোগ করেন, ‘বর্তমান সরকার দেখাতে চায় যে, তাদের পেছনে জনগণের সমর্থন আছে।’ মঙ্গলবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি জনগণকে উদযাপনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান। এই অনুষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।