মিয়াও

Printed Edition
agdum-2
মিয়াও

গোপাল রায়

তুলির বয়স আট। অনেক দিন ধরেই সে অসুস্থ। জ্বর আসে-যায়, আবার আসে। কখনো শ্বাস ভারী লাগে, কখনো মাথা ধরে ওর। বাড়ির সবাই চিন্তিত, বিশেষ করে তুলির মা। মা বারবার তুলির কপালে হাত রেখে বলে- ‘এই মেয়েটার কপালটা এত গরম কেন আবার?’

সেদিন সকালেও তুলির শরীর ভালো না। বাবা অফিস ছুটি নিয়ে মা আর তুলিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলেন। হাসপাতালের করিডোরটা সাদা, গন্ধটা কেমন যেন তীব্র। তুলি বাবার হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছিল। ডাক্তার পরীক্ষা করে ওষুধ দিলেন, বললেন- ‘চিন্তা করবেন না। সময় লাগবে; কিন্তু ঠিক হয়ে যাবে।’ ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে ফেরার সময়ই ঘটনাটা ঘটল। হাসপাতালের গেটের পাশের রাস্তায়, ভাঙা ফুটপাথের ধারে, একটি ছোট্ট বিড়ালছানা বসে ছিল। না না, বসা নয়, যেন গুটিসুটি মেরে পড়ে ছিল। শরীরটা ময়লায় ধূসর, চোখ দুটো আধখোলা। মিউ মিউ করে খুব ক্ষীণ একটি শব্দ বের হচ্ছিল। শুনতে না চাইলে শোনা যায় না। কিন্তু তুলির কানে সেটি ঠিকই ঢুকে গেল।

তুলি থমকে দাঁড়াল।

‘মা, দেখো বিড়াল ছানা।’

মা তাকালেন। একটু থমকালেন, তারপর তাড়াতাড়ি বললেন- ‘চলো, চলো, তোমার শরীর ভালো না। এসবের দিকে তাকিও না।’ তুলি বাবার হাত ছাড়িয়ে দু’পা এগিয়ে গেল। বিড়াল ছানাটার চোখের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। তুলি তার মাকে বলল- ‘ও অসুস্থ, মা। আমরাও তো ডাক্তার দেখিয়ে আসছি। ওকেও নিয়ে যাই না?’ বাবা কড়া গলায় বললেন- ‘না, বাসায় আনতে পারব না। তুমি নিজেই অসুস্থ।’

তুলি আর কিছু বলল না। কিন্তু মনটা পড়ে রইল ফুটপাথের ধারে, সেই ছোট বিড়াল ছানাটার পাশে। হাঁটতে হাঁটতে বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল সে। মনে মনে বাবাকে, মাকে কত কথা বলছিল- ‘একটি ছোট বিড়াল আনতে দিলে কী হতো। ও তো আমার মতোই অসুস্থ।’

সেদিন রাতটা খুব খারাপ গেল তুলির। জ্বর বাড়ল ওর। তুলি জ্বর ও ঘুমের ঘোরে কথা বলতে লাগল,

‘মিয়াও, মিয়াও, ও ঠাণ্ডা পাচ্ছে, ওকে কাঁথা দাও।’ তুলির ঘুমের মধ্যে এমন কথা শুনে মা ভয় পেয়ে গেলেন। তুলির মা বলললেন- ‘কার কথা বলছিস তুলি?’ তুলি চোখ না খুলেই বলল- ‘বিড়ালটা রাস্তায়, ও মরবে না তো?’ বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তুলির জ্বরের মধ্যে বলা কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল। ছোট্ট মেয়েটা, নিজে অসুস্থ হয়েও অন্য কারো অসুস্থতা ভুলতে পারছে না। এই ভাবনাটা তুলির বাবার বুক ভারী করে দিলো।

পরের কয়েক দিন তুলির জ্বর চলল। মা রাত জেগে সেবা করলেন। বাবা অফিস থেকে ফিরে চুপচাপ বসে থাকতেন। কেউ কেউ বলল, বিড়ালছানার কথা ভুলে যাও, এসব ভাবলে মন খারাপ বাড়ে। কিন্তু তুলির জ্বরের ঘোরের ভেতর থেকেও সেই শব্দটা আসত- ‘মিয়াও’।

এক সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে তুলি সুস্থ হতে শুরু করল। জ্বর নামল। সেদিন সকালে উঠে সে জানালার ধারে বসে রোদ পোহাতে লাগল। হঠাৎ নিচ থেকে একটি পরিচিত শব্দ ভেসে এলো।

‘মিয়াও!’ তুলি চমকে উঠল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল। জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে সে যা দেখল, তাতে বিশ্বাস করতে পারছিল না। একটি ছোট বিড়ালছানা। পরিষ্কার, গায়ে সাদা-ধূসর লোম। চোখ দুটো উজ্জ্বল। আঙিনায় দাঁড়িয়ে আছে। তার গলায় লাল একটি ফিতা বাঁধা। তুলি আনন্দে চিৎকার করে বলল- ‘মা! বাবা! ওটা...!’ মা এসে জানালার দিকে তাকালেন। বাবাও এলেন। বাবা হালকা হাসলেন তারপর বললেন- ‘চিনতে পারছিস?’ তুলি দৌড়ে নিচে নামল। বিড়ালছানাটা তাকে দেখেই আবার ডাকল, ‘মিয়াও!’ তুলি বসে পড়ল, আস্তে করে হাত বাড়াল। বিড়াল ছানাটা কাছে এসে তার হাতে মাথা ঘষল। সেই স্পর্শে তুলির চোখে পানি এসে গেল। বাবা ধীরে ধীরে বললেন- ‘যেদিন তুই জ্বরে বকছিলি, সেদিন রাতে আমি বেরিয়েছিলাম। ওই জায়গাটায় গিয়ে দেখি বিড়ালটা এখনো আছে। খুব খারাপ অবস্থা। পাশের একজন পশুচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। কয়েক দিন ওখানেই ছিল। আজ ও সুস্থ।’ মা বললেন- ‘আমরা ভেবেছি, তুই যদি সুস্থ হোস তাহলে তোকে সারপ্রাইজ দেবো। আর হ্যাঁ, ও আজ থেকে আমাদের সাথেই থাকবে।’

তুলি আর কথা বলতে পারল না। সে বিড়াল ছানাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। ছোট্ট হৃদয়টা যেন বড় হয়ে উঠল সেই মুহূর্তে। তুলি বলল- ‘ওর নাম মিয়াও। কারণ ও আমাকে এই শব্দেই প্রথম ডাক দিয়েছিল।’ সেদিন থেকে তুলির সবচেয়ে কাছের বন্ধু হলো মিয়াও। তুলির ওষুধ খাওয়ার সময় মিয়াও পাশে বসে থাকত। তুলি গল্প পড়লে মিয়াও বইয়ের ওপর শুয়ে পড়ত। রাতে ঘুমানোর সময় তুলির কাঁথার এক কোণে জায়গা করে নিত সে। তুলি খুব আদর করে তাকে। যখন আদর করে তখন বিড়াল ছানাটি- মিয়াও করে ডেকে ওঠে।