কলেজকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ দেখিয়ে ৭৭ লাখ টাকার অনিয়ম

প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবেই তৎকালীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে

Printed Edition

আতিকুর রহমান ঝালকাঠি

ঝালকাঠি শহরের বাসণ্ডা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘আকলিমা-মোয়াজ্জেম হোসেন ডিগ্রি কলেজকে কখনো ‘বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ হিসেবে দেখিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায় ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জেলা পরিষদের বরাদ্দে নেয়া এসব প্রকল্পের অনেকগুলোরই বাস্তব অস্তিত্ব মেলেনি বলে তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেলা পরিষদের বিভিন্ন নথিতে প্রতিষ্ঠানটির নাম একাধিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে- কখনো ‘আকলিমা মোয়াজ্জেম হোসেন ডিগ্রি কলেজ’, কখনো ‘আকলিমা মোয়াজ্জেম হোসেন কলেজ’ এবং কখনো ‘আকলিমা মোয়াজ্জেম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখিয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়ার উদ্দেশ্যেই নামের এ ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছে।

জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কলেজটির নামে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে মোট প্রায় ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে এডিবির বিশেষ বরাদ্দ থেকে ‘মসজিদ উন্নয়ন’ শিরোনামে ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের উল্লেখ রয়েছে। তবে সরেজমিন কলেজ প্রাঙ্গণে কোনো মসজিদ বা নামাজের নির্দিষ্ট স্থান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে প্রায় ৬২ লাখ টাকা বালু ভরাট, বাউন্ডারি ওয়াল, সাইকেল স্ট্যান্ড ও শহীদ মিনার নির্মাণের নামে ব্যয় দেখানো হয়েছে। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ‘গেট ও বাউন্ডারি ওয়াল’ নির্মাণে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরে একই প্রকল্পকে ‘সীমানা প্রাচীর’ হিসেবে দেখিয়ে পুনরায় অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ‘ঝালকাঠি আকলিমা মোয়াজ্জেম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ নামে আরো একটি বরাদ্দ নেয়া হয়, যার মূল্যমান ১৫ লাখ টাকা। একই সময়ে শহীদ মিনার নির্মাণে চার লাখ টাকা ব্যয়ের কথা বলা হলেও অডিটে এর কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। পরে ২০২২ সালে নতুন করে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়।

এ ছাড়া মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের শেড নির্মাণে চার লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও সরেজমিন সেখানে একটি সাধারণ খোলা কক্ষ দেখা গেছে, যার টিনের ছাউনি দেয়া হয়েছে সরকারি ত্রাণের ঢেউটিন দিয়ে।

২০২০-২১ অর্থবছরেও মাঠ ও ডোবা ভরাটের নামে পুনরায় অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। একই সময়ে ‘আকলিমা মোয়াজ্জেম হোসেন জামে মসজিদ’ উন্নয়নের নামে আরো ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও জেলার কোথাও ওই নামে কোনো মসজিদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এদিকে, জেলা পরিষদের স্টোররুম থেকে সংশ্লিষ্ট কিছু নথি গায়েব হয়ে গেছে বলে জানানো হয়, যা পুরো ঘটনাকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবেই তৎকালীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। তবে, অভিযোগ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা জানতে সংশ্লিষ্টদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঝালকাঠি জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো: শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ভবিষ্যতে কোনো ভুয়া প্রকল্প বা যাচাইবিহীন বিল অনুমোদন দেয়া হবে না। প্রতিটি প্রকল্প যথাযথভাবে যাচাই করে অনুমোদন দেয়া হবে।’

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।