ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত্যু ১০ হাজার ছাড়াতে পারে
Printed Edition
বিবিসি, আলজাজিরা ও রয়টার্স
ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় দেশটিতে পরপর দু’টি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন জায়গায় শতশত ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। তবে উদ্ধারকাজের সাথে সাথে এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, এই জোড়া ভূমিকম্পের প্রভাবে ভেনিজুয়েলায় ব্যাপক য়তি হতে পারে। এমনকি সুদূরপ্রসারী এই দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
তবে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সর্বশেষ আপডেটে ১৬৪ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন। এ ছাড়া ভূমিকম্পে ৯৭১ জন আহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটের দিকে প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনিজুয়েলায়। দুই ভূমিকম্পের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান মাত্র ৪০ সেকেন্ড ছিল বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইউএসজিএস।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ইতোমধ্যে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের জিওলোকেশন করা একাধিক ভিডিওতে ভেনিজুয়েলা-জুড়ে ভবন ও অবকাঠামোর ব্যাপক য়তি দেখা গেছে, যার মধ্যে রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মারও রয়েছে। সেখানে একটি পাহাড়ের ঢালে বেশ কয়েকটি ভবন ধসে পড়তে দেখা গেছে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, আতঙ্কিত বাসিন্দারা তাদের প্রিয়জন ও পোষা প্রাণীসহ ভবনগুলো থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তায় জড়ো হচ্ছেন। আতঙ্কিত এসব মানুষ আফটারশকের ভয়ে সারা রাত বাইরে কাটিয়েছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, এই জোড়া ভূমিকম্পের প্রভাবে ভেনিজুয়েলায় ব্যাপক য়তি হতে পারে। এমনকি সুদূরপ্রসারী এই দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এর আগে ১৮১২ সালের এক ভূমিকম্পে কারাকাসে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ইউএসজিএসের তথ্যমতে, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে প্রথম ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর কারাকাসের পশ্চিমে ইউমারের কাছে আঘাত হানে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূকম্পনটি। এরপর অন্তত ২০টি পরাঘাত (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে। জোড়া ভূমিকম্পের পর সাময়িকভাবে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা তুলে নেয়া হয়।
ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ভেনিজুয়েলার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিল ও কলম্বিয়াও কেঁপে ওঠে। ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের দেশের কিছু অংশে কম্পন টের পাওয়া গেছে এবং সরকার পরিস্থিতি পর্যবেণ করছে। তবে সেখানে কোনো ব্রাজিলীয় নাগরিক হতাহত হননি। এ ছাড়া কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা থেকেও এই ভূকম্পন টের পাওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে আলজাজিরা।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর ভেনিজুয়েলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। রাজধানী কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যালয় ও রেলসেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চাকাও এলাকার মেয়র গুস্তাভো দুকে জানিয়েছেন, তার এলাকায় দু’টি স্থাপনা ভেঙে পড়ে তিনজন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেল্লো জানিয়েছেন, পুলিশ ও দমকল বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। ভূমিকম্পের সময় কারাকাসের পালোস গ্রান্দেসের একটি ভবনের সপ্তম তলায় থাকা বিবিসির স্প্যানিশ বিভাগের সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘মনে হচ্ছিল পুরো ভবনটি মাথার ওপর ভেঙে পড়বে। জানালাগুলো কাঁপছিল, আমি একটি শক্ত পাথরের দেয়ালের মাঝে আশ্রয় নিই।’ ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্তিনেজ নামের আরেক প্রত্যদর্শী জানান, বিকট শব্দের সাথে সাথে ঘরের ফ্রিজের ভেতরের জিনিসপত্রও ধড়ফড় করে পড়ে যাচ্ছিল। অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক মারিয়া রোমেরোর মতে, ১৯৬৭ সালের ঐতিহাসিক ভূমিকম্পের চেয়েও এবারের দুর্যোগটি অনেক বেশি ভয়াবহ ছিল।
ভেনিজুয়েলার পাশে বিশ্বনেতারা, সহায়তার ঘোষণা নানা দেশের
এদিকে রয়টার্স জানায়, ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশটির জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে জরুরি সহায়তার বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। এই চরম দুর্যোগে ভেনিজুয়েলার জন্য সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে ব্রাজিল, আজেন্টিনা, মেক্সিকো ও চীনসহ নানা দেশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, এই ভূমিকম্প ভেনিজুয়েলায় একটি ধ্বংসাত্মক মৃত্যুযজ্ঞ রেখে গেছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সঙ্কটে ভেনিজুয়েলাকে ‘সাহায্য করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, ইচ্ছুক এবং সম।’ একই সাথে তিনি মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলোকে দ্রুত পদপে নেয়ার নির্দেশ দেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানায়, তারা ইতোমধ্যেই একটি দুর্যোগ সহায়তা দল এবং বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। প্রথম দিন থেকেই ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সমন্বয় করে মার্কিন উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাসামগ্রী এবং অন্যান্য জরুরি সম্পদ দেশটিতে পাঠানো হচ্ছে।
ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস এক বিবৃতিতে ট্রাম্প প্রশাসনসহ যেসব দেশের নেতারা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি জানান, সঙ্কট মোকাবেলায় মার্কিন প্রশাসন ভেনিজুয়েলার কর্তৃপরে সাথে সার্বণিক যোগাযোগ রাখছে। উল্লেখ্য, গত জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরোকে বন্দী করার পর থেকে রদ্রিগেস ভেনিজুয়েলার শাসনভার পরিচালনা করছেন। ভেনিজুয়েলার এই ভয়াবহ দুর্যোগে সবচেয়ে আগে সাড়া দিয়েছে লাতিন আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলো। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডি সিলভা জানান, তার সরকার কারাকাসের পরিস্থিতি পর্যবেণ করছে এবং তিগ্রস্তদের সহায়তায় সব ধরনের পদপে নিচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্ধারকারী দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলে। তিনি জানান, ৫০ টন আধুনিক সরঞ্জাম, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ ৩০০ জন অভিজ্ঞ উদ্ধারকারী ও প্যারামেডিক কারাকাসে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
রাজনৈতিক ও আদর্শিক বৈরিতা ভুলে ভেনিজুয়েলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আর্জেন্টিনাও। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, তার দেশ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেণ করছে এবং যেকোনো ধরনের মানবিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট কাউডিয়া শিনবাউমও জানান, তারা বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল এবং চিকিৎসক দল নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া এক বার্তায় ভেনিজুয়েলাবাসীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ‘গত রাতের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর আমরা সব ভেনিজুয়েলাবাসীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করছিÑ আমরা আপনাদের পাশে আছি।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দুর্গতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত উদ্ধারকর্মীদের ধন্যবাদ দেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন জানান, বেইজিং ভেনিজুয়লাকে তাদের সাধ্যমতো যেকোনো সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। আমেরিকার রাষ্ট্রগুলোর সংস্থার (ওএএস) মহাসচিব আলবার্ট রামদিন পানামায় এক সমাবেশে বলেন, ‘এখনো অনেক য়তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি, তবে এই কঠিন সময়ে ভেনিজুয়েলার জনগণের পাশে দাঁড়াতে পুরো দেশ প্রস্তুত রয়েছে।’ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ভেনিজুয়েলার মানুষের প্রতি তার এবং তার দেশের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তিনি নিহতদের পরিবার ও তিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনাও জানান।
বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, বলিভিয়ার জনগণের ‘হৃদয় ও প্রার্থনা ভেনিজুয়েলার তিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সাথে রয়েছে। বলিভিয়া পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেণ করছে। ভেনিজুয়েলাকে যেকোনো ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্দু ওরসি ভেনিজুয়েলার কর্তৃপ ও সাধারণ নাগরিকদের প্রতি গভীর সংহতি প্রকাশ করেছেন। উরুগুয়ে সরকার বলেছে, ভেনিজুয়েলা যেভাবে প্রয়োজন মনে করবে, সেভাবেই তারা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হওয়ার ১ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়েছে, জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) । স্থানীয় সময় গত বুধবার বিকেলের ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বহু ভবন ধসে পড়েছে আর মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে। মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।