উসমান হাদি হবো : মেরাজ তাহমিদ

Printed Edition
agdum-3
উসমান হাদি হবো : মেরাজ তাহমিদ

‘এই নিশান! এই দিকে আয় তো।’ এত দৌড়াচ্ছিস কেন রে? -মামা হাসতে হাসতে বললেন।

আমি তখন লজ্জায় মাথা নিচু করলাম। অনেক দিন পর মামাকে কাছে পেয়েছি তো! তাই মামার আগমনের আনন্দ-উল্লাস সামলাতে পারছি না। বুকের ভেতর কেমন যেন খুশির ঢেউ খেলছে। আমার এত আনন্দ-উল্লাস দেখে কে! পাড়া-প্রতিবেশীরাও বুঝে গেছে- আজ আমার আনন্দের দিন।

বিদেশ থেকে আজই দেশে ফিরেছেন মামা। দীর্ঘদিন পর আজ আমাদের বাড়িতে যেন প্রাণ ফিরেছে। বিকেলে মামা আমাকে সাথে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। হাঁটতে হাঁটতেই গল্প করছিলেন বিদেশের কথা, কাজের কথা, মানুষজনের কথা। আমার জন্য একটা স্মার্টফোনও কিনে এনেছেন মামা। ফোনটা হাতে নিয়ে কখনো এদিক-ওদিক ঘুরছি, আবার মাঝে-মাঝে স্ক্রিনে নিজের গোমড়া করা মুখটা দেখে হেসে ফেলছি। শরীর নিয়ে একটু আগে আইসক্রিম চাইতে গিয়ে মামার বকুনিও খেয়েছি। তবু মন খারাপ হয়নি, কারণ মামা যে পাশে আছেন। তা ছাড়া মামা আম্মুর কাছে শুনেছেন কিছু দিন আগে আইসক্রিম খাওয়ার কারণে আমার ভীষণ ঠাণ্ডা লেগেছিল। আমার কল্যাণের কথা ভেবেই বকা দিতেছেন মামা।

বিকেলে মামার সাথে ঘুরতে বের হলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা ভাঙা দেয়ালের পাশে মফিজ টং-এ বসলাম। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে চায়ের দোকানটা যেন আলাদা এক জগৎ। চা-ওয়ালার আদা কাটার টুকটুক শব্দ আর কাপে কাপে চা ঢালার টুংটাং আওয়াজ কানে বাজছে। চার পাশে মানুষের আনাগোনা, কথার গুঞ্জন, আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের গন্ধ, সব মিলিয়ে যেন একটা চেনা শহুরে দৃশ্য। মামা বললেন, ‘অনেক দিন হলো চা খাওয়া হয় না, তাই আজ দু’কাপ খাবো।’ আমি শুনামাত্র ফিক করে হেসে ফেললাম। মামার হাসির সাথে আমার হাসিটা মিশে গেল। হঠাৎ আমার চোখ পড়ল পাশে থাকা দেয়ালের ওপর। দেয়ালজুড়ে আমার পছন্দের সাদা, কালো আর নীল রঙে আঁকা এক তরুণের ছবি। চোখে ছিল দৃঢ়তা, মুখে ছিল অদ্ভুত এক সাহসের ছাপ। ছবির পাশে বড় বড় অক্ষরে লেখা-

‘প্রাণ দিবো, কিন্তু জুলাই দিবো না।’

নিচে লেখা নামটা পড়েই আমি থমকে গেলাম, শরীফ উসমান হাদি।

আমি অবাক হয়ে মামার দিকে তাকালাম।

মামা, তিনি কে?

মামা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,

‘শোনো তা হলে। তিনি আমাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন। সাধারণ জীবন, সাধারণ স্বপ্ন। কিন্তু অন্যায় দেখলে কখনো চুপ থাকতেন না। ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে ভয় পেতেন না। দেশের জন্য, মানুষের অধিকারের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বাজি রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক।’ মামার কণ্ঠে গভীরতা ছিল। কথাগুলো যেন আমার বুকের ভেতরে ঢুকে গেল। আমি দেয়ালের ছবিটার দিকে আবার তাকালাম। মনে হলো, লোকটা যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি ধীরে বললাম,

মামা, আমি কি উসমান হাদি হতে পারবো?

মামা আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তার চোখে ছিল বিশ্বাস আর স্নেহ। ‘অবশ্যই। তুমি চাইলে তার আদর্শ গ্রহণ করে উসমান হাদি হতে পারবে। নাম দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে মানুষ বড় হয়।’ চায়ের শেষ চুমুকটা খেতে খেতে আমি মনে মনে কথা বললাম নিজের সাথে। শহরের কোলাহল, চায়ের দোকানের শব্দ, ভাঙা দেয়ালের সেই ছবি- সব মিলিয়ে মনে হলো আজ আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে। আমি মনে মনে বললাম-

‘আমি আজ না হয় কাল, ঠিকই একদিন উসমান হাদি হবো- ইনশা আল্লাহ।’