গাজায় ৪ ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা ইসরাইলি বাহিনীর
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
উত্তর গাজায় চার ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যার দাবি করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। গত বৃহস্পতিবার রাতে দেয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, নিহত ব্যক্তিরা সেনাবাহিনীর নির্ধারিত একটি সীমারেখা- যাকে ‘ইয়েলো লাইন’ বলা হচ্ছে তারা সেটি অতিক্রম করেছিলেন। সেনাদের দাবি, ওই ব্যক্তিরা সেনাদের দিকে এগিয়ে আসছিলেন এবং তা ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ তৈরি করেছিল, তাই তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
‘ইয়েলো লাইন’ বলতে গাজার ভেতরে একটি সীমারেখাকে বোঝানো হচ্ছে, যেখানে ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান করছে। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধ-সমাপ্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের অংশ হিসেবে নির্ধারিত হয়। এই রেখার একপাশে সম্পূর্ণ ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যপাশে ফিলিস্তিনিদের চলাচলের অনুমতি রয়েছে।
এর আগে একই দিনে উত্তর গাজায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরো দু’জন আহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি গাজা সিটি ও মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলার ঘটনাও ঘটে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে দুই বছরের সঙ্ঘাত শেষ হলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত ও এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৬৫১ ফিলিস্তিনি নিহত ও এক হাজার ৭৪১ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি বন্দীর নির্যাতন মামলায় ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার
ফিলিস্তিনি এক বন্দীকে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচ ইসরাইলি সেনার বিরুদ্ধে আনা মামলা প্রত্যাহার করেছে ইসরাইলি সামরিক কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনী জানায়, কিছু ‘প্রক্রিয়াগত জটিলতা’ এবং ভুক্তভোগী বন্দীর গাজায় ফিরে যাওয়ার কারণে মামলাটি চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী জানায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেদ তেইমান আটককেন্দ্রে এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে গুরুতরভাবে নির্যাতনের অভিযোগে পাঁচজন রিজার্ভ সেনাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছিল, তারা বন্দীর ওপর গুরুতর সহিংসতা চালায় এবং ধারালো বস্তু দিয়ে তাকে আঘাত করে। তবে সেনাবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ থেকে তথ্য হস্তান্তরে জটিলতা এবং সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ভুক্তভোগীর অনুপস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। স্দে তেইমান আটককেন্দ্রটি গাজা যুদ্ধের শুরুতে গাজা থেকে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ইসরাইলি কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দীদের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়।
পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের মারধর, কাউন্সিল ভবনে আগুন
অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন এবং একটি গ্রাম কাউন্সিল ভবনের অংশে আগুন দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সূত্র। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির বিবৃতিতে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার রাতে জেরিকোর দক্ষিণে আকাবাত জাবের শরণার্থী শিবিরে অভিযানের সময় ইসরাইলি সেনারা তিন তরুণকে মারধর করে। চিকিৎসাকর্মীরা জানান, মারধরের ফলে আহত ওই তিনজনকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া উত্তর পশ্চিমতীরের সালফিত এলাকায় এক তরুণকে মারধর করে ইসরাইলি সেনারা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, শহরের উত্তরের প্রবেশপথের কাছে ওই তরুণকে মারধর করা হয় এবং তার কাছে থাকা প্রায় ৩৫ হাজার শেকেল জব্দ করা হয়। অন্য দিকে নাবলুসের দক্ষিণে আইনাবুস গ্রামের কাউন্সিল ভবনের একটি গুদামঘরে আগুন দেয় অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। স্থানীয় সূত্র জানায়, পাশের ইয়িতজহার বসতি থেকে আসা লোকজন হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমতীরেও সহিংসতা বেড়েছে। ফিলিস্তিনি তথ্যানুযায়ী, এ সময় অন্তত এক হাজার ১২৭ জন নিহত, প্রায় ১১ হাজার ৭০০ জন আহত এবং প্রায় ২২ হাজার জন গ্রেফতার হয়েছেন।
গাজায় সহিংসতাকে স্বাভাবিক বলে দেখানো বিপজ্জনক : বিশ্লেষণ
গাজায় সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমেছে- এমন যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা বিপজ্জনক বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, হত্যার হার কমে গেলেও যদি বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তবে সেটিকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখানো বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। এই বিতর্কের সূত্রপাত ইন্দোনেশিয়ার কূটনীতিক অ্যালোয়িসিয়াস সেলওয়াস তাবোরাতের মন্তব্য ঘিরে। তিনি বলেন, হতাহতের সংখ্যা কমে আসা হয়তো কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল হতে পারে। তবে সমালোচকদের মতে, এমন বক্তব্য চলমান মানবিক সঙ্কটকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ঝুঁকি তৈরি করে। আলোচনায় আরো বলা হয়েছে, গাজার পরিস্থিতি ঐতিহাসিক শান্তি প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করা ঠিক নয়। যেমন উত্তর আয়ারল্যান্ড বা বলকান অঞ্চলের সঙ্ঘাত ধীরে ধীরে আলোচনার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। কিন্তু গাজায় এখনো ব্যাপক সামরিক শক্তির অসম ব্যবহার এবং গভীর মানবিক সঙ্কট বিদ্যমান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান আইনি বিতর্কের প্রেক্ষাপটে গাজার ঘটনাকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কারণ সংখ্যার পতনকে অগ্রগতি হিসেবে দেখানো হলে তা জবাবদিহির বদলে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ ঘটাতে পারে।
তাদের মতে, কূটনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত সহিংসতা কমানো নয়, বরং পুরোপুরি বন্ধ করা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সীমান্তে বিধিনিষেধে গাজায় মানবিকসহায়তা তীব্রভাবে কমেছে
সীমান্ত পারাপারে ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে গাজা উপত্যকায় মানবিক ও খাদ্যসহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছে গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির। কার্যালয়ের মহাপরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সীমান্ত ক্রসিংগুলো খুব সীমিতভাবে চালু রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সহায়তার তুলনায় খুব সামান্য অংশই গাজায় প্রবেশ করতে পারছে। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে গাজায় প্রবেশের কথা ছিল ছয় হাজার ত্রাণবাহী ট্রাকের। কিন্তু বাস্তবে ঢুকতে পেরেছে মাত্র ৬৪০টি ট্রাক, যা মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সীমাবদ্ধতার কারণে মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হচ্ছে এবং বিভিন্ন সেবা খাত মৌলিক কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুতর সমস্যায় পড়ছে। গাজায় প্রায় ২৪ লাখ মানুষের জন্য খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।