পবিত্র কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে কত নেকি! : মোহাম্মদ নাছির হোসাইন

Printed Edition
islami logo
পবিত্র কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে কত নেকি! : মোহাম্মদ নাছির হোসাইন

হজরত ইবনে মাসউদ রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন- যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে নেকি বা পুণ্য অর্জন করবে। পুণ্য বা নেকিকে দশগুণ বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। আমি বলছি না যে, (আলিফ-লাম-মীম) একটি অক্ষর; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর ও মীম একটি অক্ষর। (তিরমিজি, মিশকাত)।

কিন্তু হাদিসটির ভিন্ন একটি অনুবাদে পাওয়া যায়, তা হচ্ছে : যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে। পুণ্য বা নেকিকে দশগুণ বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। আমি বলছি না যে, (আলিফ-লাম-মীম) একটি অক্ষর; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর ও মীম একটি অক্ষর।

হাদিসটির এই দুই অনুবাদে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। প্রথম অনুবাদে বলা হয়েছে- আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করলেও নেকি পাওয়ার কথা, একটি অক্ষরের জন্য ‘একটি নেকি’ এভাবে নেকির সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়নি। অপর দিকে দ্বিতীয় অনুবাদে বলা হয়েছে- আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করলে ‘একটি নেকি’ পাওয়ার কথা- নেকির সংখ্যা এভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

লক্ষণীয়, কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশ নেকি, এটা সরাসরি হাদিসের কথা নয়। আর প্রথম অনুবাদ থেকে ‘কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশ নেকি’- এ কথা বলাও যায় না। বলা যায়- ‘কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশগুণ নেকি হয়’। কিন্তু দ্বিতীয় অনুবাদ থেকে ‘কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশ নেকি’- এ কথা বলা যায় এবং বলাও হয়। আর এভাবে ‘কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশ নেকি, হাদিসের বক্তব্য হিসাবে আমাদের সমাজে বহুলভাবে প্রচলিত হয়ে আসছে। প্রায় সমাজের সব স্তরের মুসলিম এ কথাটা জানে, বিশ্বাস করে এবং নিজ নিজ সময় ও সুযোগ অনুযায়ী এ বুঝের ওপর আমল করে নেকি বা পুণ্যের সংখ্যা বাড়াতে সচেষ্ট হন।

নেকি গণনার বিষয় নয়-ওজনের বিষয় : কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশ নেকি এর অর্থ হচ্ছে, নেকি বা পুণ্য একটি গণনার বিষয়- হাতের আঙ্গুলে বা ক্যালকুলেটরে গণনা করার মতো। সংখ্যাটাই মূল বিষয়, একেবারে চূড়ান্ত বিষয়। যত বেশি কুরআনের অক্ষর পাঠ করা হয়, নেকির সংখ্যা তত দশগুণ বেড়ে যায়। আর এতে নেকির সংখ্যা হাজার হাজার লাখ লাখ কোটি কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

নিজের আমলনামা বা একাউন্টে নেকির এই বিশাল সংখ্যার কারণে মুমিন-মুসলিম মাত্রই শেষ বিচারের দিনে মুক্তির সম্ভাবনা দেখতে পায়। কিন্তু হাশরের মাঠে নেকির এই হিসাবটি চূড়ান্ত নয়, বরং সঠিকও নয়। কারণ কঠিনতম ওই দিনে পাপ-পুণ্যের হিসাব গণনা নয়, গুণগত মান হিসাবে ওজন করা হবে। ইসলামে এ বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট। কুরআনের নিম্নের আয়াতগুলো এ ব্যাপারে খেয়াল করি :

সেদিন যা সত্য, তা ওজন করা হবে। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে- তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে- যেহেতু তারা আমার নিদর্শনসমূহকে প্রত্যাখান করত। (সূরা : আরাফ : ৮-৯) এবং কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করবো ন্যায় বিচারের মানদণ্ড। সুতরাং কারো প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না এবং কর্ম যদি তিল পরিমাণ ওজনেরও হয়, তবু উহা আমি উপস্থিত করব, হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। (সূরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৪৭)

মানুষের কর্ম, তা পাপ বা পুণ্য হোক- তা যে ওজন করা হবে, আল-কুরআনে এ রকম আয়াত আরো রয়েছে। সুতরাং হাদিসের সূত্র ধরে কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশ নেকির যে গণনার হিসাব করা হয়, তা কুরআনে নেকি ওজন করার স্পষ্ট বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক।

সৎকাজের নেকির সংখ্যার গণনা ভুল পথে নিয়ে যায় : এক হিসাবে কুরআনুল কারিমের মোট অক্ষর সংখ্যা ৩,২৩,৬৭১টি। (সূত্র : আল-কুরআনের বিষয়ভিত্তিক আয়াত ও বিশ্লেষণ, গবেষণা ও উপস্থাপনা : অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামসুল আলম)

প্রতি অক্ষরে দশ নেকি, এ হিসাবে একবার কুরআন পাঠে নেকির সংখ্যা হচ্ছে ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৭১০টি। আল-কুরআন নাযিল হওয়ার পর থেকে এ পবিত্র গ্রন্থ অনেকেই পড়েছেন- আল্লাহর রাসূল সা: পড়েছেন, সাহাবিগণ, তাবে-তাবেয়ীগণ পড়েছেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত কুরআন পাঠের এই ধারা চালু রয়েছে এবং অনাগত দিনেও এই ধারা চালু থাকবে। প্রতি অক্ষরে দশ নেকি হিসাবে একবার পুরো কুরআন পাঠে এরা সবাই বরং প্রত্যেকে সমানসংখ্যক নেকি পাওয়ার কথা। কিন্তু এই সমান সংখ্যার নেকির ওজন গুণগত মানের কারণে মানুষ ভেদে যে বিশাল পার্থক্য হবে- তা তো একেবারে স্পষ্ট এবং যৌক্তিক।

নেকির প্রতিদান সংখ্যায় নয়, গুণনে : মুমিন-মুসলিমের আমল বা নেকি প্রাপ্তির বিষয়ে কুরআনুল কারিমের এ আয়াতগুলো খেয়াল করি :

আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। আর যদি তা সৎকর্ম হয়, তবে তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে আরো বিপুল পুরস্কার দান করেন। (সূরা: নিসা : ৪০) কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে আর কেউ কোনো অসৎকাজ করলে তাকে শুধু তার সমান প্রতিফলই দেয়া হবে। বস্তুত তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। (সূরা : আনআম : ১৬০) যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে এক শ’ করে শস্যদানা থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (সূরা : বাক্বারা : ২৬১)

কুরআনুল করিমের উপরোক্ত আয়াতগুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসেছে। সব আয়াতে সৎকাজের প্রতিদান সংখ্যায় উল্লেখ হয়নি- ‘গুণে’ উল্লেখ করা হয়েছে। আর এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের (তাঁর প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক) নিম্নের হাদিসটিও খেয়াল করি : আদম সন্তানের সব আমলের প্রতিদান দশগুণ হতে সাত শ’গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন : রোজা আমার জন্যই এবং আমিই তার প্রতিদান দেব। (মিশকাত)

হাদিসটি তো একেবারে স্পষ্ট। কুরআনের উপরোক্ত সবগুলো আয়াতের সমন্বয় হয়েছে হাদিসটিতে। চূড়ান্ত কথা হচ্ছে- সৎকাজের প্রতিদান গুণনে, গুরুত্বে - সংখ্যায় নয় মোটেও।

আল-কুরআনের আয়াত অথবা হাদিসের অবশ্যই একটি বক্তব্য বা নির্দেশনা থাকে। আলোচ্য হাদিসে কুরআন পাঠে দশগুণ নেকি পাওয়ার নিশ্চয়তা উল্লেখ করে কুরআনুল কারিম পাঠে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। নেকির সংখ্যার হিসাব করা মোটেও উদ্দেশ্য নয়, কর্মের দশগুণ পুরস্কার পাওয়ার বক্তব্য রয়েছে এতে। আর তা কুরআনের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আয়াত, হাদিস এবং ইসলামের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। সুতরাং কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশ নেকি, কথাটা সঠিক নয়। বরং কুরআন পাঠে প্রতি অক্ষরে দশগুণ নেকি হয়, এ কথাটাই সঠিক এবং ইসলাম সম্মত।

লেখক : মাস্টার মেরিনার (ক্যাপ্টেন), মেরিন সার্ভেয়ার ও কনসালটেন্ট।