হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেই যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুদ্ধের খরচ আরব দেশগুলোর ওপর চাপানোর চেষ্টায় ট্রাম্প
  • যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
  • মধ্যপ্রাচ্যে আসতে শুরু করেছে মার্কিন বাহিনীর প্যারাট্রুপার
  • হিজবুল্লাহর সাথে লড়াইয়ে ইসরাইলের ৪ সেনা নিহত
  • হরমুজে টোল আদায় অনুমোদন ইরানের পার্লামেন্টের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগত পরিবর্তন এনে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের বিস্তৃতির মধ্যেই ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি সচল না হলেও ট্রাম্প তার চার-ছয় সপ্তাহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে সামরিক অভিযান গুটিয়ে নিতে আগ্রহী। তবে এই যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনার সমান্তরালে তিনি এক বিশাল আর্থিক চাপের ছক কষছেন; হোয়াইট হাউজ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই যুদ্ধের কয়েক শ’ বিলিয়ন ডলারের আকাশচুম্বী ব্যয়ভার মেটাতে ট্রাম্প আরব মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের আদলে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোকেই পেন্টাগনের এই ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানের বিল পরিশোধ করতে হতে পারে।

এ দিকে এই সঙ্ঘাতের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজার এখন খাদের কিনারায়। চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে তেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন চার ডলার ছাড়িয়েছে, যা আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম মার্চ মাসে রেকর্ড ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই অস্থিরতার মাঝেই দুবাই বন্দরে কুয়েতি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানি ড্রোন হামলা এবং দুবাই-আবুধাবির শেয়ার বাজার থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের মূলধন হারিয়ে যাওয়া বৈশ্বিক আর্থিক বিপর্যয়কে আরো ত্বরান্বিত করেছে। এক দিকে ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্যারাট্রুপার মোতায়েন, অন্য দিকে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালীতে ‘টোল’ আদায়ের নতুন আইন- সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্ঘাত এখন চরম অনিশ্চয়তা ও বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী ট্রাম্প

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি সচল না হওয়া সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান শেষ করতে আগ্রহী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা মনে করছেন হরমুজ প্রণালী খোলার অভিযান পরিচালনা করলে যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহের নির্ধারিত সময়সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই আপাতত ইরানের নৌ-শক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার গুঁড়িয়ে দেয়ার মূল লক্ষ্য অর্জিত হলেই যুদ্ধ বিরতির কথা ভাবছেন তিনি। ট্রাম্পের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো- তৎক্ষণাৎ সঙ্ঘাত কমিয়ে কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে পরে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করা। যদিও সামরিক বিকল্পগুলো এখনো টেবিলে রয়েছে, তবে সেগুলো এখন তার ‘তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার’ নয়।

ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ

অন্য দিকে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর ‘টোল’ বা মাশুল আরোপের একটি পরিকল্পনা দেশটির সংসদীয় কমিশনে অনুমোদিত হয়েছে। এই পরিকল্পনায় রিয়াল ভিত্তিক টোল ব্যবস্থা এবং ইরানের ‘সারভৌমত্ব’ প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন ও ‘জায়নবাদী’ (ইসরাইলি) জাহাজ চলাচলে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রস্তাবও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে বলে জানিয়েছে মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ‘কেপলার’।

যুদ্ধের খরচ আরবদের ওপর চাপানোর চেষ্টা

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার বহনে আরব দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট সোমবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প এই যুদ্ধের খরচ হিসেবে আরব দেশগুলোর কাছ থেকে কয়েক শ’ বিলিয়ন ডলার দাবি করতে আগ্রহী।

সংবাদ সম্মেলনে লেভিটকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো এবারও মিত্র দেশগুলো এই যুদ্ধের খরচ দেবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট তাদের (আরব দেশগুলো) এই আহ্বান জানানোর বিষয়ে বেশ আগ্রহী। আমি তার পক্ষ হয়ে আগেই চূড়ান্ত কিছু বলছি না, তবে এটি এমন একটি ধারণা, যা নিয়ে আপনারা শিগগিরই তার কাছ থেকে আরো বিস্তারিত শুনতে পাবেন।

যুদ্ধের আকাশচুম্বী খরচ

পেন্টাগনের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ৬ দিনেই খরচ হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, ১২তম দিনে এই খরচ ১৬.৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। বর্তমানে যুদ্ধের ৩১তম দিনে এই বিল কয়েক গুণ বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউজ ইতোমধ্যে কংগ্রেসের কাছে যুদ্ধের তহবিল ও গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাজেট চেয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক শন হ্যানিটি প্রস্তাব করেছেন যে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত হিসেবে ইরানকেও তেলের মাধ্যমে যুদ্ধের পুরো খরচ পরিশোধ করতে বাধ্য করা উচিত।

দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজারে ধস

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান দুই শেয়ারবাজার- দুবাই ও আবুধাবিতে ভয়াবহ ধস নেমেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই দুই বাজারে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার মূলধন হারিয়েছে, যা বর্তমানে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় বিপর্যয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুবাইয়ের প্রধান সূচক প্রায় ১৬ শতাংশ এবং আবুধাবির সূচক ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে দুবাই ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট হারিয়েছে ৪৫ বিলিয়ন ডলার এবং তুলনামূলক বড় আবুধাবি সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ (অউঢ) হারিয়েছে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলারের মূলধন। ফলে বিশ্বজুড়ে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত বাজার হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে এই দুই বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ৪ বছরে সর্বোচ্চ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে চার বছরের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন চার ডলার ছাড়িয়েছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য মতে, বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম চার ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এক ডলারেরও বেশি।

মূলত ইরান কর্তৃক কৌশলগত হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলার ফলে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম মার্চ মাসে রেকর্ড ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন পরিবারগুলোর ওপর তীব্র আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

কুয়েতি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা

দুবাই বন্দরে নোঙর করা কুয়েতের একটি বিশালাকার অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে আল সালমি নামক জাহাজটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং এর হুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং এতে কোনো তেল নিঃসরণ বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

কুয়েত পেট্রলিয়াম করপোরেশন নিশ্চিত করেছে যে, ড্রোন হামলার সময় জাহাজটিতে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল, যার বাজার মূল্য প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। জাহাজটি কুয়েত ও সৌদি আরব থেকে তেল নিয়ে চীনের কিংডাও বন্দরের দিকে রওনা হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। জাহাজে থাকা ২৪ জন নাবিকের সবাই নিরাপদে আছেন বলে নিশ্চিত করেছে দুবাইয়ের সমুদ্র অগ্নিনির্বাপক দল। এই হামলার খবরের পর পরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দেয়।

মধ্যপ্রাচ্যে হাজারো মার্কিন প্যারাট্রুপার

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াতে নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ‘৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন’-এর হাজার হাজার প্যারাট্রুপার মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছতে শুরু করেছে। সোমবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যেই এই অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করছেন।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশেষ বাহিনীকে মূলত তিনটি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে- ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রফতানির কেন্দ্র ‘খার্গ দ্বীপ’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়া; ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা; হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আওতায় যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ইরানের ১১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তবে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩০০-এর বেশি আহত হয়েছেন।

ভূমি ব্যবহারে ইতালির নিষেধাজ্ঞা

স্পেন ও যুক্তরাজ্যের পর এবার ইউরোপের আরেক দেশ ইতালি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূমি ব্যবহারে বাধা প্রদান করেছে। একটি উচ্চপদস্থ সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে সিসিলি দ্বীপের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের যে অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্র করেছিল, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইতালি সরকার।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় মিত্রদের একের পর এক এমন নিষেধাজ্ঞা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লজিস্টিকস ও কৌশলগত সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

ইসরাইলের পেতাহ তিকভা ও বেনি ব্রাকে হামলা

ইরান থেকে ছোড়া একঝাঁক শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলীয় শহর পেতাহ তিকভা ও বেনি ব্রাক। সোমবার রাতে চালানো এই আকস্মিক হামলায় জনবহুল পেতাহ তিকভায় বেশ কিছু আবাসিক ভবন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য দিকে, বেনি ব্রাক শহরে অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হানলে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেপণাস্ত্র রুখে দিলেও বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত হানে। হামলার পর পরই তেলআবিব, শ্যারন ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সতর্কতা সাইরেন বাজানো হয় এবং হাজার হাজার আতঙ্কিত বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। উদ্ধারকারী দলগুলো জানিয়েছে, বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন, তবে নিহতের বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি।

ইসফাহানে ‘সামরিক স্থাপনায়’ বিমান হামলা

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ ইসফাহানে সোমবার রাতে ব্যাপক বোমা হামলার খবর পাওয়া গেছে। প্রদেশের গভর্নরের কার্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা আকবর সালেহি এক প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন যে, হামলাগুলো মূলত নির্দিষ্ট কিছু ‘সামরিক স্থাপনা’ লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। তবে কোন কোন অবস্থানে আঘাত হানা হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি।

আকবর সালেহি আরো জানান, এই হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা হতাহতের সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। উল্লেখ্য, ইসফাহান প্রদেশ ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং এখানে নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া এই প্রদেশে বদর বিমানঘাঁটি, অষ্টম শিকারি বিমানঘাঁটি এবং চতুর্থ বিমানবাহিনী ঘাঁটির মতো প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবস্থান।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের নতুন দফার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। গত এক ঘণ্টায় দুবাইয়ে অন্তত পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দুবাই বন্দরে একটি কুয়েতি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তবে এতে কোনো হতাহত হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবেলা করছে।

এ দিকে সৌদি আরব, বাহরাইন ও কাতারও গত রাতে বেশ কিছু হামলা প্রতিহত করার খবর দিয়েছে। দুবাইয়ে প্রচণ্ড ঝোড়ো আবহাওয়ার মধ্যেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপশন বিস্ফোরণগুলো স্পষ্ট বোঝা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর, উপকূলীয় স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিগুলো এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল।

ইরানে ৩০০ শতাধিক চিকিৎসাকেন্দ্র ও ৭৬০টি স্কুলে হামলা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় এ পর্যন্ত ৯০ হাজার ৬৩টি আবাসিক ইউনিট, ৩০৭টি স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা কেন্দ্র এবং ৭৬০টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এই তথ্য জানিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। দেশ দুটি শুধু সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হচ্ছে দাবি করলেও বেসামরিক স্থাপনাও রেহাই পাচ্ছে না। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গত সোমবারের তথ্য মতে, দেশটিতে চলমান হামলায় নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছে ২৪ হাজারের বেশি মানুষ।

দক্ষিণ লেবাননে ৪ ইসরাইলি সেনা নিহত

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সাথে সম্মুখযুদ্ধে আরো চার ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে। গত ২ মার্চ লেবানন ফ্রন্ট খোলার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১০ জন ইসরাইলি সেনা প্রাণ হারালো। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ১২০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে তিনজন জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষীও প্রাণ হারিয়েছেন।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু লিটানি নদী পর্যন্ত ‘বাফার জোন’ তৈরির লক্ষ্যে আক্রমণ আরো জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসরাইলের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা দক্ষিণ লেবানন দখলের দাবি তুলছেন। অন্য দিকে, হিজবুল্লাহর বর্তমান প্রধান নাঈম কাসেম জানিয়েছেন, তারা এই যুদ্ধকে ইসরাইলের জন্য চরম ব্যয়বহুল করে তুলবেন।