নির্মাণ খাতে নানা সঙ্কটেও বিপুল সম্ভাবনা

নিজস্ব উদ্যোগে ভবন নির্মাণ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রবৃদ্ধি : ব্যয়, বৈষম্য ও অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নির্মাণ খাত শুধু একটি উৎপাদনশীল খাত নয়; এটি কর্মসংস্থান, নগরায়ণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সড়ক, সেতু, আবাসন, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন কিংবা গ্রামীণ বসতবাড়ি- সব েেত্রই নির্মাণ কার্যক্রমের বিস্তার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে এই খাতের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। ব্যক্তি পর্যায়ে (খানা) নিজস্ব উদ্যোগে ভবন নির্মাণের ব্যয় কাঠামো, নির্মাণ উপকরণের ব্যবহার, শ্রমের অবদান, প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানার ধরন, নারীর অংশগ্রহণ, কর্মসংস্থান এবং মূল্য সংযোজনের বিশ্লেষণ করলে একটি ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক সমীা বলছে, নির্মাণ খাত এখনো ব্যাপকভাবে অনানুষ্ঠানিক, ব্যক্তিনির্ভর এবং লিঙ্গ বৈষম্যপূর্ণ। একই সাথে খাতটির উৎপাদনশীলতা বাড়লেও করপোরেট কাঠামো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির েেত্র বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

শ্রম ও নির্মাণসামগ্রীই ব্যয়ের মূল চালিকাশক্তি

দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব উদ্যোগে পাকা ও সেমিপাকা ভবন নির্মাণ করছে। এসব নির্মাণের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় ব্যয় হয় শ্রম এবং মৌলিক নির্মাণসামগ্রীর পেছনে।

সমীায় দেখা গেছে, খানাধীনে নিজস্ব উদ্যোগে নির্মিত একটি পাকা ভবনের গড় নির্মাণ ব্যয় প্রতি বর্গফুটে ২ হাজার ৫২৫ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, ২৫ দশমিক ১৮ শতাংশ, শ্রমিকের মজুরিতে ব্যয় হয়। নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে ইটের পেছনে ব্যয় হয় ১৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ, সিমেন্টে ১৫ শতাংশ এবং লোহা ও ইস্পাতে প্রায় ১০ শতাংশ। এ ছাড়া ফিক্সচার, ফিটিংস ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে মোট ব্যয়ের ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ ব্যয় হয়।

অর্থাৎ একটি পাকা ভবন নির্মাণে মোট ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শ্রম ব্যয়ে এবং বাকি বড় অংশ নির্মাণসামগ্রী ও সমাপ্তিকরণ কাজে ব্যবহৃত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যয় কাঠামো থেকে স্পষ্ট হয় যে, দেশের আবাসন নির্মাণ এখনো শ্রমনির্ভর হলেও ইট, সিমেন্ট ও লোহা-ইস্পাতের মতো মৌলিক নির্মাণসামগ্রীর ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। ফলে এসব উপকরণের দামের সামান্য পরিবর্তনও ভবন নির্মাণের মোট ব্যয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রামে নির্মাণ ব্যয় শহরের চেয়ে বেশি

সমীায় উঠে এসেছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী চিত্র। সাধারণভাবে শহরে নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ার ধারণা প্রচলিত থাকলেও বাস্তবে গ্রামীণ এলাকায় পাকা ভবন নির্মাণে গড় ব্যয় প্রতি বর্গফুটে ২ হাজার ৫৫৭ টাকা, যা শহরাঞ্চলের ২ হাজার ৫০৯ টাকার তুলনায় কিছুটা বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামে নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ, দ শ্রমিকের সীমিত প্রাপ্যতা, যন্ত্রপাতির স্বল্প ব্যবহার এবং নির্মাণকাজের অধিকাংশ ধাপ কায়িক শ্রমনির্ভর হওয়ায় ব্যয় তুলনামূলক বেড়ে যায়।

ব্যয়ের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণেও গ্রাম-শহরের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। গ্রামীণ এলাকায় মোট নির্মাণ ব্যয়ের ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ ইটের পেছনে ব্যয় হয়, যেখানে শহরে এ হার ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

তবে সিমেন্ট ও লোহা-ইস্পাতের ব্যবহার দুই অঞ্চলে প্রায় একই মাত্রায় রয়েছে। শ্রম ব্যয়ই উভয় েেত্রই সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হলেও গ্রামে এর হার ২৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা শহরের ২৪ দশমিক ৪২ শতাংশের চেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দ শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বেশি হওয়ায় কায়িক শ্রমের প্রয়োজন তুলনামূলক কম।

অন্য দিকে নির্মাণ-পরবর্তী ফিনিশিং কাজ ও আধুনিক সুবিধা সংযোজনের েেত্র শহর এগিয়ে। শহরে ফিক্সচার ও ফিটিংসে মোট ব্যয়ের ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ ব্যয় হয়, যেখানে গ্রামে তা ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। একই সাথে অন্যান্য বা ওভারহেড ব্যয়ও শহরে ২৫ দশমিক ০২ শতাংশ, যা গ্রামের ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশের তুলনায় বেশি। এটি উন্নত নকশা, আধুনিক উপকরণ এবং উচ্চমানের সমাপ্তিকরণ কাজে শহরাঞ্চলের বাড়তি বিনিয়োগের প্রতিফলন।

সেমিপাকা ভবন : কম ব্যয়ে বিকল্প

সমীায় দেখা গেছে, সেমি-পাকা ভবন নির্মাণে প্রতি ইউনিট গড় ব্যয় ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং প্রতি বর্গফুটে নির্মাণ ব্যয় ১ হাজার ৬২০ টাকা। ফলে একই আয়তনের একটি পাকা ভবনের তুলনায় সেমি-পাকা ভবন নির্মাণে প্রায় ৩৬ শতাংশ কম খরচ হয়। তবে ব্যয়ের পরিমাণ কম হলেও এর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য পাকা ভবনের তুলনায় বেশ ভিন্ন।

ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেমিপাকা ভবনে মোট ব্যয়ের ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশ ইটের পেছনে ব্যয় হয়, যা পাকা ভবনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিপরীতে সিমেন্টের ব্যবহার কমে ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং লোহা-ইস্পাতের ব্যবহার নেমে আসে ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় কাঠ ও কাঠজাত পণ্যের ব্যবহারে। এ খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা পাকা ভবনের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। একই সাথে শ্রম ব্যয়ও কমে ১৯ দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা অপোকৃত সহজ নির্মাণপ্রক্রিয়া ও কম জটিল কাঠামোর প্রতিফলন।

বিশ্লেষকদের মতে, হালকা কাঠামো, কম রিইনফোর্সড কংক্রিটের ব্যবহার এবং কাঠনির্ভর নির্মাণপ্রযুক্তির কারণে সেমিপাকা ভবনের মোট নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। তবে শহরাঞ্চলে এসব ভবনে লোহা-ইস্পাত, উন্নতমানের ফিক্সচার ও ফিটিংসের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেগুলো অধিক টেকসই ও মানসম্মত হয়। অন্য দিকে গ্রামীণ এলাকায় কাঠের ব্যবহার, স্থানীয় উপকরণের ওপর নির্ভরতা এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ের অংশ বেশি হওয়ায় ব্যয় কাঠামোতেও ভিন্নতা দেখা যায়।

নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা : ব্যক্তিনির্ভর খাত

সমীায় দেখা গেছে, দেশের প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ শিল্প এখনো মূলত ব্যক্তিনির্ভর এবং করপোরেট কাঠামোর বিকাশ তুলনামূলকভাবে সীমিত। সমীায় অন্তর্ভুক্ত ২৭৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৭ দশমিক ২৬ শতাংশই একক মালিকানার (সোল প্রোপ্রাইটরশিপ) ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া ১১ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সাধারণ অংশীদারিত্বের (পার্টনারশিপ) এবং ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সমীাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চিত্র নির্মাণ শিল্পে করপোরেটায়নের ধীরগতির প্রতিফলন। পাবলিক লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শেয়ারবাজারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিভিত্তিক করপোরেট সুশাসনের েেত্র সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, নির্মাণ খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, করপোরেট বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং আধুনিক ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

নেতৃত্ব ও কর্মসংস্থানে লিঙ্গ বৈষম্য

সমীায় দেশের নির্মাণ শিল্পে মালিকানা ও নেতৃত্বের েেত্র প্রকট লিঙ্গ বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, সমীাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ৯৯ দশমিক ২৮ শতাংশই পুরুষদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। বিপরীতে মাত্র ০ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে নারী মালিকানা বা নেতৃত্ব রয়েছে। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের কোনো ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বও পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ দেশের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থাননির্ভর এই খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত। অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, নির্মাণ শিল্পে নারীর এত সীমিত অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন, প্রশিণ, দতা উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নীতিগত সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শুধু লিঙ্গ বৈষম্যই কমবে না, বরং নির্মাণ শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং টেকসই প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হবে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে সমীাভুক্ত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে মোট কর্মরত ছিলেন তিন হাজার ১৩৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই হাজার ৭৬৬ জন বা ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং নারী ৩৭১ জন বা ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন কর্মীর মধ্যে মাত্র ১২ জন নারী, যা নির্মাণ শিল্পে কর্মসংস্থানের েেত্রও স্পষ্ট লিঙ্গ বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। প্রতিষ্ঠানের আকারভেদে এ বৈষম্যের চিত্র আরো স্পষ্ট হয়েছে। বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে মোট এক হাজার ৩৫৭ জন কর্মীর মধ্যে নারী রয়েছেন মাত্র ১৩৭ জন বা ১০ দশমিক ১ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে ৭৮১ দশমিক ৩৯ লাখ টাকার মোট বেতন ব্যয়ের ৮৪ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষ কর্মীদের পেছনে ব্যয় হলেও নারীদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ।

মাঝারি প্রতিষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। ১ হাজার ৬৮ জন কর্মীর মধ্যে ২০৭ জন নারী, যা মোট কর্মীর ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এখানেই নারীরা সর্বোচ্চ বেতন অংশ পেয়েছেন; ৭৭১ দশমিক ৬৭ লাখ টাকার মোট বেতন ব্যয়ের ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ তাদের জন্য ব্যয় করা হয়েছে। বিপরীতে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা মাত্র ২৭ জন বা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ৩৯৫ দশমিক ৯৩ লাখ টাকার মোট বেতন ব্যয়ের ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ কর্মীদের পেছনে ব্যয় হলেও নারীদের অংশ মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এই পরিসংখ্যান নির্মাণ শিল্পে নারী অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

উৎপাদন বনাম মূল্য সংযোজন : মাঝারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে

নির্মাণ খাতের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা মূল্যায়নের েেত্র মোট উৎপাদন (আউটপুট), মধ্যবর্তী ভোগ (ইন্টারমিডিয়েট কনজাম্পশন) এবং স্থূল মূল্য সংযোজন (জিভিএ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। সমীায় দেখা গেছে, সমীাভুক্ত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট উৎপাদনের পরিমাণ ৮১ হাজার ৭৪৬ লাখ টাকা। এর বিপরীতে কাঁচামাল, জ্বালানি, সেবা ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বাবদ মধ্যবর্তী ভোগ হয়েছে ৫১ হাজার ৬২১ লাখ টাকা। ফলে মোট স্থূল মূল্য সংযোজন দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১২৫ লাখ টাকা, যা মোট উৎপাদনের ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ উৎপাদিত প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৭ টাকা নতুন মূল্য হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের আকারভেদে মূল্য সংযোজনের হারেও পার্থক্য দেখা যায়। বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মোট উৎপাদন পাঁচ হাজার ৯৯৯ লাখ টাকা, মধ্যবর্তী ভোগ তিন হাজার ৯৬২ লাখ টাকা এবং মূল্য সংযোজন দুই হাজার ৩৭ লাখ টাকা, যা মোট উৎপাদনের ৩৪ শতাংশ। অন্য দিকে মাঝারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ৩৪ হাজার ৫৩৭ লাখ টাকা, মধ্যবর্তী ভোগ ২১ হাজার ৭৯০ লাখ টাকা এবং মূল্য সংযোজন ১২ হাজার ৭৪৭ লাখ টাকা। এ েেত্র মূল্য সংযোজনের হার ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ, যা বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, মাঝারি আকারের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক দতার সাথে উৎপাদন পরিচালনা করছে। একই সাথে এসব প্রতিষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণও বেশি হওয়ায় উৎপাদনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সার্বিক মূল্যায়ন

সমীার তথ্য বলছে, বাংলাদেশের নির্মাণ খাত এখনো মূলত ব্যক্তি উদ্যোগনির্ভর এবং অনানুষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য বহন করছে। ব্যক্তিপর্যায়ে ভবন নির্মাণে শ্রম, ইট, সিমেন্ট ও লোহা-ইস্পাতই ব্যয়ের প্রধান উপাদান। অন্য দিকে সেমিপাকা ভবনে কাঠের ব্যবহার এবং ব্যয় কাঠামোর ভিন্নতা নির্মাণ প্রযুক্তির বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে একক মালিকানার আধিপত্য, পাবলিক লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি, নারী নেতৃত্বের ঘাটতি এবং ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে নারীদের প্রায় অনুপস্থিতি খাতটির কাঠামোগত দুর্বলতা নির্দেশ করে। তবে মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজন সৃষ্টি এবং নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে ইতিবাচক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করতে হলে করপোরেটায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর নির্মাণ, দ মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন বৃদ্ধি এবং নারী উদ্যোক্তা ও কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। তবেই দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্প খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নেরও শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারবে।