সম্পর্ক ভালো হলেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে না : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

Printed Edition

নীলফামারী প্রতিনিধি

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন বলেছেন, যখন খুব ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছিল যে সম্পর্কের স্বর্ণযুগ চলতেছে। এ রকম ভালো সম্পর্ক কোনো দিন ছিল না। তখন কি সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়েছিল? হয়নি। ভারতীয় পলিসি বা ভারতীয় কার্যক্রম বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সম্পর্ক যতই ভালো করেন না কেন। আর এখন তো আপনারাই বলেন যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এক ধরনের টানাপড়েন চলছে।

গতকাল রোববার বিকেল সাড়ে ৫টায় নীলফামারীতে এক হাজার ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত রিজার্ভ ঘাটতির চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রকাশিত প্রেস রিলিজে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

এ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে, আগামী ৯ ডিসেম্বরে ৫ বছর মেয়াদি ৩,০০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ডের (রি-ইস্যু) নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। কাগজে এটি “রুটিন নিলাম” হিসেবে উল্লেখ থাকলেও অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে- এটি সরকারের নগদ ঘাটতি পূরণের এক জরুরি অনুসন্ধান। বর্তমান তারল্য সঙ্কট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আইএমএফ শর্ত, রাজস্ব ঘাটতি এবং সরকারের ব্যয় চাহিদার কঠিন সমন্বয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে এই নিলামকে শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয় বরং রাষ্ট্রের আর্থিক অস্থিরতা,নগদ সঙ্কট ও নীতির ব্যর্থতার স্পষ্ট সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তারল্য অবস্থার সার্বিক চিত্র : উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিচ্যুতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে, মোট নেট তারল্য ইনজেকশন দাঁড়িয়েছে +৩২৩.৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তারল্য ঘাটতি এতটাই বেড়েছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়মিত টাকা ঢালতে হচ্ছে। একই দিনে এসডিএফের মাধ্যমে -২,০৮০.৭২ কোটি টাকা ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিলেও দিন শেষে নেট ইনজেকশন পজিটিভ থাকে- যা দেখায়, ব্যাংকগুলো আমানত রাখলেও তাদের তারল্য চাহিদা আরো বেশি। এই পরিস্থিতি বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ সঙ্কট, আমদানি বিল পরিশোধে চাপ, বৈদেশিক ঋণ রোলওভার জটিলতা এবং প্রাইভেট সেক্টরে আমানত কমে যাওয়ার প্রতিফলন।

ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টরের ঝুঁকি বাড়ছে : আইবিএলএফ (ইসলামী ব্যাংক লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি) ১৪ দিনের অফার ও টাকা গ্রহণ শূন্য। ২৮ দিনের আইবিএলএফে ২০০ কোটি টাকা অফার এবং পুরো ২০০ কোটি টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। রেটে বৈষম্যও আছে- আইবিএলএফ ৪.৫০% -এর বিপরীতে এসডিএফ ৮%।

১৪ দিনের সুবিধায় কোনো ব্যাংক অংশ না নেয়া বোঝায় যে ইসলামী ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গালভরা অনিশ্চয়তায় আছে। অন্য দিকে ২৮ দিনের পুরো টাকা গ্রহণ করে তারা দীর্ঘমেয়াদি তারল্য ঘাটতির গভীর সঙ্কটে পড়েছে। যা ইঙ্গিত করে যে- ইসলামী ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি তারল্য সঙ্কটে রয়েছে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়াকে ঝুঁকি মনে করছে এবং আড়ালে অস্বাভাবিক রিজার্ভ ঘাটতির চাপ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত দুই বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শেয়ারহোল্ডার সঙ্কট, বড় ঋণ অনিয়ম, সিন্ডিকেট লোন এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক।

এসডিএফের উচ্চ সুদহার কঠোর বাজার সঙ্কেত : এসডিএফ হার এখন ৮%। এটি কঠোর মুদ্রানীতি, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত রিজার্ভ শোষণের নীতির প্রতিফলন। কিন্তু এসডিএফ থেকে টাকা সরকার সংরক্ষণ করলেও দিন শেষে নেট ইনজেকশন আবারো পজিটিভ- যা স্পষ্টভাবে দেখায় : ব্যাংকিং সিস্টেমে স্বাভাবিক রিজার্ভ নেই, বাজারে টাকার অভাব তীব্র, ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারি সিকিউরিটিজের চাপ বাড়ছে এবং আমদানি বিল পরিশোধে ব্যাংকগুলো কঠিন অবস্থায় রয়েছে।

সংখ্যাগুলো যেসব গভীর ঝুঁকি আড়াল করছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রেস রিলিজ শুধু সারণি দেখালেও অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে একাধিক গভীর সঙ্কট সামনে আসে। ফরেক্স সঙ্কট ঢাকতে টাকায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ডলার বাজারে চাহিদা মেটাতে না পারায় স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ছে; ফলে তারল্য ঘটতি সৃষ্টি হচ্ছে।

সরকারি বিল পরিশোধের চাপ ব্যাংকগুলোতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। রাজস্ব ঘাটতি বাড়ায় সরকার ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে ঢালছে, ফলে তারল্য সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে। ব্যাংকিং সেক্টরে সিস্টেমিক রিস্ক বাড়ছে, এতে অনেক ব্যাংক আইনি তারল্য অনুপাতে ঘাটতিতে পড়ছে এবং নির্বাচনোত্তর অনিশ্চয়তা আমানতকারীদের আচরণেও প্রভাব ফেলছে। বর্তমান তারল্য সঙ্কট তারই প্রতিচ্ছবি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীরবতা : বড় অঘটনের আভাস : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রেস রিলিজে কোনো ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে- ডিসেম্বরে এলসি পরিশোধের চাপ বাড়ছে, আইএমএফ রিজার্ভ শর্ত পূরণ কঠিন, ডলার সঙ্কট মোকাবেলায় সোয়াপের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে গোপনে সহায়তা দিতে গিয়ে তারল্য চাপে নতুন ধাক্কা লেগেছে।

বাজারে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া : অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন- অতিরিক্ত ইনজেকশন মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে, ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টরে সিস্টেমিক ঝুঁকি গভীর হবে এবং বিনিময় হার অস্থিতিশীল হতে পারে। ব্যাংকাররা বলছেন- “এটা টাকার সঙ্কট নয়; এটি আস্থার সঙ্কট।” ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিট সাজানোর চাপ ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের জটিলতার সময়েই ৩২৩.৪২ কোটি টাকার নেট ইনজেকশন পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে বলে ইঙ্গিত দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়তো এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, কিন্তু চাপে রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য এটি নিছক দিনের হিসেব নয় বরং গভীর তারল্য সঙ্কট, ব্যাংকারি নীতির দুর্বলতা এবং ফরেক্স বাজারের চাপের প্রতিচ্ছবি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি এই চাপ সামলাতে নতুন নীতি ঘোষণা করবে নাকি দ্রুত কঠোর মুদ্রানীতির আরো ধাপ আসছে- সেটাই দেখার বিষয়।

ট্রেজারি বন্ড নিলাম : আর্থিক বিপদের লুকানো সঙ্কেত : সরকার এখন তিন ধরনের তীব্র চাপে- ক্যাশ সঙ্কট, আইএমএফ সংস্কার চাপ এবং ব্যাংকিং সেক্টরের তারল্য ঘাটতি। রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার ২১% কম; আমদানি বিল আটকে আছে; নিয়মিত ব্যয় চালাতে সরকার দ্রুত অর্থ প্রয়োজন। আইএমএফ বলেছে, ঋণ নিতে হলে বাজারভিত্তিক হতে হবে। অন্য দিকে ব্যাংকগুলো ডলার সঙ্কটে বিপর্যস্ত; আমানত প্রবাহ কম; খেলাপি ঋণ আবারো বাড়ছে আর ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা ক্যাশ প্রবাহ শুকিয়ে দেয়ায় বন্ড নিলামই সরকারের একমাত্র ভরসা।

উচ্চ কুপন হার : বাজারের সতর্ক সঙ্কেত : কুপন হার ১০.৭৯%- যা দেখায় সরকারের ঋণ ব্যয় ভয়াবহভাবে বেড়েছে, বাজার সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে এবং এই ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ সরকারকেও বহন করতে হবে। এক সময় বাংলাদেশে সরকারি বন্ড রিটার্ন ছিল ৬-৭%। এখন ১১% ছুঁইছুঁই। অর্থাৎ সরকার ঋণ নিতে গেলে এখন আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সুদ দিতে হচ্ছে।

পাইকারি ব্যাংকিং সেক্টরের অভ্যন্তরীণ নথি বলছে, ব্যাংকগুলো এখন বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে ভয় পাচ্ছে। খেলাপি ঋণ বাড়ছে, রফতানি আয় কম, আমদানি ব্যয় বাড়ছে। ফলে নিরাপদ সরকারি বন্ডই তাদের প্রধান আশ্রয়।

ইন্স্যুরেন্স ও করপোরেট ফান্ডের জন্য এটি ঝুঁকিমুক্ত আকর্ষণীয় সুযোগ। ১০.৭৯% কুপন হার মানে- ৫ বছরের ট্যাক্স সেফ রিটান। অন্য দিকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নেই; এফডিআই কমছে- যা আর্থিক আস্থার আরো এক সঙ্কেত।

প্রযুক্তিগত জটিলতা : জিএমএসভিত্তিক নিলামের পাশাপাশি “বিশেষ পরিস্থিতিতে ম্যানুয়াল বিড গ্রহণ” করার সুযোগ রাখা প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ও ডিজিটাল সক্ষমতার অভাবের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি মিললেও তিনটি ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। প্রথমত. প্রাইভেট সেক্টরে ঋণ সঙ্কট আরো বাড়বে : ব্যাংকগুলো টাকা বন্ডে ঢাললে কারখানা, কৃষি ও এসএমইতে ঋণ কমবে।

দ্বিতীয়ত, সরকারি ঋণ টেকসই থাকবে না : উচ্চ সুদের কারণে বাজেট ব্যয় বাড়বে; নতুন বন্ড ইস্যুর প্রয়োজন বাড়বে এবং সরকারের ঋণ সার্ভিস খরচ মহামারীর মতো বাড়বে।

শেষে, বাজারে মুদ্রানীতির সঙ্কোচন আরো কঠিন হবে : এসডিএফ হার এখন ৮%, ট্রেজারি বিল হার ১০-১১% আর বন্ড কুপন ১০.৭৯%। এটি সরাসরি অর্থনীতিকে উচ্চ সুদ-উচ্চ ঝুঁকি-উচ্চ অনিশ্চয়তা চক্রে আটকে ফেলছে।

রাজনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন চাপে সরকার : যে তিনটি তথ্য সবচেয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে- ১. সরকারের রাজস্ব ঘাটতি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এটা দুর্বল প্রশাসন ও রাজনৈতিক টালমাটালের ইঙ্গিত। ২. আইএমএফ প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে ব্যর্থতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আইএমএফ চাইছে- বাস্তব বিনিময় হার; উন্নত ঋণ ব্যবস্থাপনা; স্বচ্ছতা। ব্যাংকিং সংস্কার এই নিলাম আইএমএফকে দেখানোর একটি প্রয়াস মাত্র। ৩. অর্থনীতি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঢুকে গেছে। ব্যাংকাররা বিশ্বাস করছেন : “২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে নগদ সঙ্কট এতটাই তীব্র হয়ে উঠছে যে সরকারের জন্য বারবার বন্ড নিলাম ছাড়া আর কোনো পথ নেই।” এতে নিলাম সফল হবে - কিন্তু সঙ্কট কাটবে না। ৩,০০০ কোটি টাকার ট্রেজারি বন্ড নিলাম নিশ্চিতভাবেই সাবস্ক্রাইব হবে, কারণ ব্যাংকগুলো নিরাপদ রিটার্ন চাইছে। কিন্তু এর মাধ্যমে আর্থিক সঙ্কটের আগুন সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা যাবে; স্থায়ী সমাধান মিলবে না; ব্যাংকিং সেক্টরের তারল্য চাপ আরো বাড়বে এবং সরকারের ঋণ খরচ আরো উপরে উঠবে। এই নিলাম তাই রাষ্ট্রের আর্থিক সঙ্কটের এক নির্মম বাস্তব স্বীকারোক্তি।