দিগন্ত সাহিত্য কবিতাবলী
Printed Edition
সোলায়মান আহসান
ঝরনার চা
বন্ধুর বাসায় আমি- আতিথ্য গ্রহণে স্মিতবাক,
টেবিলের প্রান্ত ভরা নানা পদ সুখাদ্য সুঘ্রাণে;
বয়স বলছে- না না খেয়ো না, বাঁচবে না প্রাণে
কে মানে- যে মানে বেরসিক, থাক সব মানা থাক।
অবশেষে শেষ হলো ভোজন অসহ পেটপুরে
তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা কথার জাবর কাটাসহ
প্রস্তাব হলো চা, যদি তা হয় পাটালি গুড়সহ
সাধু সাধু; প্রস্তাবিত আহ্বান রাখা অন্তঃপুরে!
খাবার টেবিল ছেড়ে গালগল্পে মেতে উঠি ক্ষণ
তিনটি চায়ের কাপ ঘরে ঢুকে চোখ আসে মুদে
চা এলো চা এলো আহা, কী সুখ মুহূর্তে চনমন
চা নয় অমৃত যেন গরুর দোহানো খাঁটি দুধে!
তারপর ঘুম নয়, রাত নয়, কথার বুনন
ঝরনার চায়ে রেশ কাটে না কিছুতে (বিচ্ছুরণ)!
ওমর বিশ্বাস
বরফ কুচি
কাচের জানালার ওপাশে লেপ্টে থাকা শীতের বরফ কুচি
জীবন সায়াহ্নে নুয়ে যায় অপরাহ্নের রোদের মতোন
কাচের শরীরজুড়ে শুয়ে থাকে আর গায়ে লাগে অদেখা শীতলা শিহরণ
সেখান থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছবোধ
কঙ্কালের মতো এঁকেবেঁকে ছুটে যায় ভাটির দেশে
শরীরের শিরা-উপশিরা ধরে নামতে নামতে গহীনে হারিয়ে যায়।
ইতিহাসের বয়স হয় এভাবেই মিশে যওয়া সময়ের হাতে
এ রহস্য আজো অজস্র বছর ধরে আসা ধারাবাহিকতা পাল্টাতে পারেনি
জীবনের যাপিত নামহীন ফলকগুলো উঁকি দিয়ে যায়
কুয়াশার ভাঁজগুলো খুলে খুলে
এভাবেই চলছে আদিম থেকে আসা আজ।
শিশিরে কাচগুলো ধুয়ে যায়
রেখা রেখা স্মৃতিচিহ্নগুলো আদমের শুরু থেকে
এ পর্যন্ত আসে পৃথিবীর বুকে ছাপ ফেলে
আধুনিক গতিতেও তাই-
শিশির তো আর ফেরত আসে না।
পৃথিবীর বয়সের হিসাব জানি না
যেই শীত লেগেছিল - আজো
সহস্র কোটি বছর জেগে আছে শরীরে বসবাসের ত্বকে।
হুসাইন আলমগীর
কতটা পরীক্ষা তুমি নেবে- নাও
ভীষণ অস্থির অস্থির লাগছে--
একটা অদৃশ্য ইঁদুর অগত্যা আমাকে তাড়া করছে
কোথাও স্থিরই হতে পারছি না---
আমার বুকের অনেক গহীনে গর্ত খোঁড়ার প্রস্তুতি টের পাচ্ছি, আমি
কী হলো আমার!
আমি কি কাউকে হারাতে বসেছি?
আমার গ্রীবার খুব কাছে কেউকি বন্দুক তাক করে আছে?
নাকি আল্লাহর কোন সিদ্ধান্ত আমাকে মেনে নিতে হবে, এখনই?
আমি ভীষণ ক্লান্ত হে প্রভু
এতটুকু দাঁড়াবার শক্তিটুকু প্রত্যাহার করা হলে
হাঁটু গেড়ে বসে পড়া আত্মসমর্পণকারী হবো আমি
আমাকে ক্ষমা করুন, প্লিজ
পরীক্ষা দেয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা আমার নেই
এই যে, আমার এ পোড়া কপাল রেখে দিলাম তোমার এ পবিত্র পায়ে
এখানেই গন্তব্য আমার।
কতটা পরীক্ষা তুমি নেবে, নাও
তবে, এ যাত্রায় যদি হেরে যাই, যদি বা হারাই
একটি শব্দও লিখব না আর
ব্যর্থতার দায় নিয়ে যোগ দেবো নক্ষত্র পাড়ায়।
মাহফুজ জোহা
প্রত্যাশার পারদ
ঠোঁটে নাগরিক সভ্যতা নামুক
একটি প্রগাঢ় বিশুদ্ধ চুম্বন
শুষে নিক সব দূষিত অতীত
মন খারাপের অশুদ্ধ দিনলিপি
ফ্যাসিস্টের সকল চিহ্ন মুছে যাক।
যারা অর্থ কিংবা অন্যান্য সুবিধের বিনিময়ে
তাদের পুনর্বাসনে ব্যস্ত
তাদেরও সকল অসুখ দূরীভূত হোক
মনস্তাত্ত্বিক চিন্তায় তারাও মানুষ হোক
ঘাস না খেয়ে তারা ঘাস খাওয়া গাভীর
দুগ্ধ পান করুক
তাপদাহের পর প্রচণ্ড বৃষ্টি নামুক
সবুজে ভরে যাক-
পৃথিবীর তাবৎ মরুভূমি
শুধু জনতার না হয়ে
পৃথিবী অন্তত এবার মানুষের হোক।
রিপন বর্মন
ভোর ফুটতে না ফুটতে
ভোর ফুটতে না ফুটতে গোরস্থানে
কিছু সাদা পায়রা, অশোকের সুর লয়ে
পালক মেলেছে রোদে।
এ রোদ সোনালি রোদ,
এ রোদ নতুন সকালের
এ রোদের দিন এসেছে
বিগত রাতের রক্তস্রোতে।
ভাঁটফুলের গন্ধের মত মলিন বাতাস
বারুদে বারুদে ভারি!
ভোর ফুটতে না ফুটতে
সবুজ ঘাসের বুকে
চিরনিদ্রার বিষণ্ণ কামড়।
মোজাফফার বাবু
রাধাচূড়া কৃষ্ণচূড়া
রাধাচূড়া কৃষ্ণচূড়া সোনালু
নগরীর উষ্ণ পরশ বোলায়
একঘেয়েমি যাপিত জীবনে
উপচে পড়ে রক্তিম শোভা
হাতিরঝিল সংসদ ভবন ক্রিসেন্ট লেক
ক্লান্ত পথিক থমকে দাঁড়ায়
গ্রীষ্মের প্রকৃতির দীপ্ত কথামালা
নির্মলতার আবাস ছড়ায়
তপ্ত কাঠফাটা রোদ,যখন চোখ টাটায়
পিচঢালা রাজপথ বারুদের স্তূপ
দুর্গম জীবনের আনন্দ দেয় রঙ্গন
আগুনে ফাগুনে কৃষ্ণচূড়া ফুল
কনকচূড়া সোনালু হলুদে
চোখে প্রশান্তির নীল বেগুনি
ভেসে আসে বাদামি চিলের ডাক
উদাস করে, অজানা হাতছানি
নীলাভ লেকে কলকলে জল
দুপারে পলাশ কাঠগোলাপ
গোলাপির যাবনীতা পায় প্রকৃতি
কপত কপোতী ফাগুনে আগুন!