শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে অনড় ককরোচরা
মোদি সরকারের অসম্মতিতে সঙ্ঘাত বাড়ছে
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। গতকাল শুক্রবার সরকারের সাথে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর সিজেপি জানিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে সরকার শনিবার বিকেল পর্যন্ত সময় চেয়েছে এবং এই সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়ে দিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মানা হবে না। তা ছাড়া আন্দোলনকারীদের মোকাবেলায় নিজেদের সংগঠনের ছাত্রদের মাঠে নামানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। ফলে সঙ্ঘাত আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সংবাদ থেকে জানা যায়, শুক্রবার বিকেলে কনস্টিটিউশন ক্লাবে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকারের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং। অন্য দিকে সিজেপির প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা।
বৈঠক শেষে সিজেপির আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরকার শনিবার দুপুর পর্যন্ত সময় চেয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার তাকে দ্রুত সরিয়ে দেবে। এ ছাড়া আত্মহননকারী নিট পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হওয়া এফআইআর ও মামলা প্রত্যাহারে সরকার রাজি হয়েছে।’
এর আগে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেয়া ও পরীক্ষার অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়ার দু’টি শর্ত সরকার মেনে নেয়ার পরই সিজেপি আলোচনায় বসতে রাজি হয়। বৈঠক শেষে জে পি নাড্ডা জানান, প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলেছে। সিজেপির প্রধান তিনটি দাবি ও পরীক্ষার বিষয়ে পাঁচটি সংস্কারমূলক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারের ভেতরে আলোচনা করে শনিবার দুপুরের বৈঠকে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সরকারের আশ্বাসের পর ২৬ দিনের অনশন ভাঙেন অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক জানান, ইতঃপূর্বে মৌখিক আশ্বাস দেয়া হলেও আনুষ্ঠানিক নথির দাবিতে তার অনশন শেষ করতে দুই দিন দেরি হয়েছিল। এ ছাড়া বৈঠকের আগে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেও জানিয়ে দিয়েছিলেন, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস-কাণ্ডে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে তারা সন্তুষ্ট হবেন না। গত সোমবার (২০ জুলাই) দুই পক্ষের মধ্যে সর্বশেষ আলোচনা হয়েছিল। ওই সময় সিজেপির মুখপাত্ররা জে পি নাড্ডার বাসভবনে বৈঠক করেছিলেন। পরে তারা অভিযোগ করেছিলেন, ওই বৈঠকে তাদের কার্যত নজরবন্দী করে রাখা হয়েছিল এবং এরপরই তারা একটি নিরপেক্ষ স্থানে ভবিষ্যৎ আলোচনার দাবি জানান।
এ দিকে গতকাল গভীর রাতে এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির বিধান রেখে একটি খসড়া বিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্যও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। এ দিকে ছাত্রদের বিক্ষোভ প্রশমিত করার অংশ হিসেবে শিক্ষাসচিব বিনীত জোশিকে পঞ্চায়েত রাজ মন্ত্রণালয়ে বদলি করেছে কেন্দ্র সরকার এবং স্কুল ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের শীর্ষ পদগুলোতে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) অনড় থাকলেও, বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার। তারা স্পষ্ট বলে দিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মানা হবে না। সরকারের শীর্ষ সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি নিশ্চিত করেছে যে, ৫৭ বছর বয়সী এই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনাই নেই ও সরকার তার পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে।
সিজেপি ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আন্দোলন প্রত্যাহার বা রাজপথ ছাড়ার প্রথম ও প্রধান শর্তই হলো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ বা বরখাস্তকরণ। তবে সরকারের শীর্ষ সূত্রগুলো এই সম্ভাবনা সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ মেনে নেয়ার পথ সরকার বেছে নেবে না।
শীর্ষ সরকারি সূত্র এনডিটিভি-কে জানিয়েছে, সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘পদত্যাগ নেয়া হলো সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্ত।’ সরকারের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করে ওই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, দেশের জনগণ আমাদের ওপর আস্থা রেখে ম্যান্ডেট দিয়েছে ও আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করে দেখাব। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নাকচ করার পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনকারী সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএর সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
সরকারি সূত্রটি আরো যোগ করে জানান, জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার নানা ধরনের সমস্যা ও ত্রুটিগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করছে সরকার, এবং শিগগিরই এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্ত একাধিক চক্র ও গ্যাংকে আমরা এরই মধ্যে ধরে ফেলেছি ও তাদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছি। এই বিষয়ে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কাজ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এ দিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রাস্তায় নেমেছে বামপন্থী সংগঠনগুলো। এবার পশ্চিমবঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে রাস্তায় নামার ঘোষণা দিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) ছাত্র সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় শিক্ষার্থী পরিষদের (এবিভিপি) অন্য শাখা সংগঠনগুলো।
মূলত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবির বিপরীতে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইছে আরএসএসের শাখা সংগঠনগুলো। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- এবিআরএসএম, এবিভিপি ও বিদ্যা ভারতীর মতো ছাত্র সংগঠনগুলো একত্রে হাত মিলিয়ে মাঠে নামছে। আরএসএস ছাত্র সংগঠনগুলো পক্ষ থেকে ‘শিক্ষা সংস্কৃতি সুরক্ষা মঞ্চ’ নাম দিয়ে রাজ্যজুড়ে মিছিল ও পথসভা পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই মধ্যে তারা বেশ কয়েকটি বৈঠক সেরে নিয়েছে।
‘শিক্ষা সংস্কৃতি সুরক্ষা মঞ্চের’ পক্ষ থেকে উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে এক প্রতিবাদী সমাবেশের ডাক দেয়া হয়। সেখানে যোগ দিতে আরএসএসকে সমর্থন করে এমন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজনকে আহ্বান জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি জলপাইগুড়ি জেলায় মিছিল ও পথসভার ডাক দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া কলকাতাসহ উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিম বর্ধমান, ঝাড়গাম ও নদীয়া জেলায় মিছিল ও পথসভার ডাক দিয়েছে ‘শিক্ষা সংস্কৃতি সুরক্ষা মঞ্চ’। তবে দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই কলকাতায় আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন। এ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনগুলো পথে নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।