ফিরে দেখা জুলাই ’২৪
গণগ্রেফতার, কারফিউ আর নতুন দাবিতে মোড় নিলো আন্দোলন
Printed Edition
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
কোটা সংস্কার আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের পর ২৫ জুলাই ছিল একদিকে গণগ্রেফতার, কারফিউ ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিন; অন্য দিকে আন্দোলনের দাবি কেবল কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও বিচার নিশ্চিত করার নতুন রাজনৈতিক বার্তা দেয়ার দিন। টানা সহিংসতার পর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন জেলায় নতুন করে শত শত মানুষ গ্রেফতার হন। ১৭-২৫ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ৯ দিনে সারা দেশে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য জানায়। রাজধানী ঢাকায়ই গ্রেফতার হন দুই হাজার ২০৯ জন। পাশাপাশি নাশকতা ও সহিংসতার অভিযোগে ঢাকার বিভিন্ন থানায় দুই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়। র্যাবও জানায়, সাম্প্রতিক নাশকতার ঘটনায় পৃথক অভিযানে তারা ২২৮ জনকে আটক করেছে।
কারফিউর ষষ্ঠ দিনে ঢাকাসহ গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাত ঘণ্টা কারফিউ শিথিল রাখা হয়। সরকারি-বেসরকারি অফিস ও ব্যাংক দ্বিতীয় দিনের মতো সীমিত সময়ের জন্য চালু থাকে। রাজধানীর গুলিস্তান, গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাসটার্মিনালে দূরপাল্লার যাত্রীদের উপস্থিতি বাড়তে দেখা যায়। কারফিউ শিথিল থাকায় সীমিত পরিসরে নৌযান চলাচলের অনুমতি দেয় বিআইডব্লিউটিএ। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পরদিন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। রাজধানীজুড়ে সেনাবাহিনীর টহল, বিভিন্ন মোড়ে চেকপোস্ট এবং যানবাহনে তল্লাশি অব্যাহত ছিল।
এ দিন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেন যে, আন্দোলন এখন আর শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপন জারি আংশিক অগ্রগতি হলেও আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছাত্র-নাগরিক হত্যা ও গুম-খুনের বিচার, দায়ীদের জবাবদিহি, সব মামলা প্রত্যাহার, গ্রেফতারকৃত নিরপরাধদের মুক্তি, আহত-নিহতদের ক্ষতিপূরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় সন্ত্রাসের অবসান নিশ্চিত করা। একইসাথে তিনি উল্লেখ করেন, কোটা সংস্কার বিষয়ে সংসদে আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নাহিদের এই বক্তব্য আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে আলোচনায় আসে। অন্য দিকে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী মঞ্চ’ এক বিবৃতিতে ২৩ জুলাই জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনকে ‘আংশিক বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করলেও আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভেতরে মতপার্থক্যের ইঙ্গিতও প্রকাশ পায়।
দিনটির আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল ক্ষতিগ্রস্ত মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি। স্টেশন ঘুরে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি জনগণের কাছে বিচার চান এবং বলেন, এমন ধ্বংসযজ্ঞ দেশের মানুষ করতে পারে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে একই সময় আন্দোলনে নিহতদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা আরো তীব্র হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার এই সফর নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা এবং ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে সঙ্ঘাতের মানবিক মূল্যও সেদিন আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চিকিৎসাধীন আরো তিনজনের মৃত্যুর খবর আসে। বিভিন্ন সূত্রে আন্দোলনকেন্দ্রিক মৃতসংখ্যা দুই শতাধিকে পৌঁছানোর তথ্য প্রকাশিত হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গ থেকে পরিচয়হীন বহু মরদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংগঠনটি জানায়, কয়েক দিনের ব্যবধানে তারা অন্তত ২১টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। ভোরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে গ্রেফতার করা হয়। অন্য দিকে নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের মধ্যে ৩৮৯ জন আত্মসমর্পণ করেন বলে জানায় পুলিশ।
দেশজুড়ে অচলাবস্থার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমও স্বাভাবিক হয়নি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ২৮, ২৯ ও ৩১ জুলাই এবং ১ আগস্টের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। একই সময় ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি চালু, কারফিউ প্রত্যাহার এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলনকারীদের দেয়া ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি।