রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা

স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরে গেল

Printed Edition
first-2
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা জেলা রুকন সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটি কালো ছায়া সরে গেল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি কী কারণে পদত্যাগ করেছেন, সে বিষয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ আমরা আগেই বিবেচনায় নিয়েছি যে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।

গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, যদি তার বিরুদ্ধে কোনো বিশ্বাসযোগ্য আলামত পাওয়া যায়, তাহলে কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নন। বিষয়টি বিবেচনা করেই আমরা আমাদের পদক্ষেপ ঠিক করব, ইনশাআল্লাহ।

তিনি আরো বলেন, তার দায়ভার আছে, তিনি তা অস্বীকার করতে পারেন না। অভিভাবক হিসেবে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। গণহত্যার বিরুদ্ধে তিনি একটি কথাও বলেননি, ‘এটা থামাও’, ‘এটা অন্যায়’, ‘জনগণের ওপর জুলুম’ এ ধরনের কোনো বক্তব্য আমরা তার মুখে শুনিনি। নীরবে তিনি সমর্থন দিয়েছেন।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আজকে তার বক্তব্যে জেনেছি, তিনি গুরুতর অসুস্থ, মাঝে মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ কারণে তিনি দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে ও বিশ্রামে থাকতে চান। বিষয়টি সরকার দেখবে, আমরাও খেয়াল রাখব। তবে আমি মনে করি, সব ধরনের চিকিৎসাই দেশে সম্ভব। আমার নিজেরও একটি জটিল রোগ হয়েছিল, চিকিৎসকরা বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি যাইনি। এখানেই চিকিৎসা নিয়েছি। আমি চাই সবাই দেশেই চিকিৎসা নিক। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনা যেতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি শুধু তার ক্ষেত্রেই নয়, সবার ক্ষেত্রেই চাই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, যেই হোন না কেন, সবাই যেন দেশের ভেতরেই চিকিৎসা নেন। নির্বাচিত ব্যক্তিরা যদি সবাই বিদেশে চলে যান, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত হবে কিভাবে? দেশের চিকিৎসকরা আস্থা ফিরে পাবেন কিভাবে? তারা তাদের কর্তব্য বুঝবেন কিভাবে? তাই আমাদের সবারই দেশে চিকিৎসা নেয়া উচিত।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমান স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আমরা তাকে অভিনন্দন জানাই। তিনি যতদিন দায়িত্ব পালন করবেন, আমরা আশা করি ন্যায়নিষ্ঠ, নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। কারো প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব করবেন না এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষা করবেন। এক দিনের জন্যও যদি তিনি দায়িত্ব পালন করেন, তবুও আমরা চাই তিনি একইভাবে দায়িত্ব পালন করুন। তিনি যদি এভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে আমরা তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। আমরা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সুস্বাস্থ্য কামনা করি।

তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। যেহেতু এর মধ্যেই সংসদের অধিবেশন হওয়ার কথা রয়েছে, তাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করি। সময় এলে আমাদের ভূমিকা কী হবে, তা আপনারা দেখতে পাবেন। বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাক, এটাই সবার প্রত্যাশা। সংবিধান অনুযায়ী তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ায় ডেপুটি স্পিকার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়েই এ সাংবিধানিক দায়িত্বের বিষয়টি সম্পন্ন হয়েছে। তাই এখানে কোনো সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হওয়ার কথা নয়। আমরা চাই কোনো সঙ্কট তৈরি না হোক। তবে জনগণের যে মৌলিক প্রত্যাশা, একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশ। সেদিকে নবগঠিত সংসদ এখনো এগোয়নি। আমরা সংসদের ভেতরে ও বাইরে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখব।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হবে। যিনি প্রার্থী হবেন, তার প্রস্তাবক, সমর্থক ও সম্মতি থাকবে। একাধিক প্রার্থী হলে সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। আমরা রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষা করতে পারে এমন রাষ্ট্রপতি চাই, কোনো তোষামোদকারী নয়। আমরা যে সংস্কারের কথা বলছি, তা তোষামোদের সংস্কৃতি শেষ করার জন্যই। যার যার অবস্থানে সবাই মর্যাদার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন, অন্য কারো নির্দেশে নয়; নীতি মেনে চলবেন। রাষ্ট্রপতিও রাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন, অন্য কারো কাছে নিজের বিবেক সমর্পণ করবেন না, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

গণভোটের রায় উপেক্ষা করে জনগণের মতামতকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। পরিবর্তনের জন্য গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা পাশ কাটিয়ে সরকার নিজেদের ইচ্ছামতো দেশ পরিচালনা করছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। একই নির্বাচনের একটি রায় গ্রহণ করা হবে, আরেকটি প্রত্যাখ্যান করা হবে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

গতকাল রাজধানীর ইনস্টিটিউটশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে ঢাকা জেলা জামায়াতে ইসলামীর ষান্মাসিক সদস্য (রুকন) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। ঢাকা জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মাওলানা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান (এমপি), নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন (এমপি) এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল (এমপি)। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মো: আফজাল হোসাইন। সম্মেলনে আরো বক্তৃতা করেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক মো: মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মসিউল আলম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক ড. ইলিয়াস মোল্লা ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালের লগি-বৈঠার ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তির গণহত্যার রাজনীতি শুরু হয়। এরপর পিলখানা হত্যাকাণ্ড, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, শাপলা হত্যাকাণ্ড এবং জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ- এসবই জাতির ইতিহাসে ধারাবাহিক গণহত্যার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তিনি শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাইয়ের সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ঘোষণার আগে ছাত্রদের আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল। দল নিষিদ্ধ হওয়ার পরও জনগণ ও নেতাকর্মীদের রাজপথে নামার আহ্বান জানানো হয়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ রেখে অভিযান পরিচালনা করায় জুলাইয়ে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আহত ও পঙ্গুদের যথাযথ খোঁজ নেয়া হয়নি। শহীদ ও আহত পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেয়া উচিত ছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের পরও তাদের প্রতি প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করা হয়নি।

জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতাদের সংগঠন নয়, মানুষের সংগঠন।’ তাই ভুলত্রুটি হতে পারে, তবে নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। কেউ ভুল করলে তাকে অবশ্যই সংশোধনের আওতায় আসতে হবে। তিনি নেতাকর্মীদের নফস ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকার এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করার আহ্বান জানান।

প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। অন্যদেরও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। বাংলাদেশ শান্তিতে থাকতে চায়, তবে সীমান্তে অশান্তি সৃষ্টি করা হলে তার প্রভাব উভয় দেশকেই বহন করতে হবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে সব ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবেন। নেতা ও নীতির সংশোধনের মাধ্যমেই সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।