৬০ দেশের ওপর ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপ

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক সুবিধা পেল বাংলাদেশ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্যিক শুল্ক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কহার পেয়েছে। এর ফলে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডসহ প্রধান পোশাক রফতানিকারক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আরো শক্তিশালী হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ১৯৭৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যাক্টের ৩০১ ধারার আওতায় জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত শেষে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) বিশ্বের ৮৬টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ৬০টি অর্থনীতির জন্য নতুন শুল্কহার ঘোষণা করেছে।

২৩ জুলাই ঘোষিত এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গতকাল ওয়াশিংটন সময় রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারার আওতায় পূর্বে আরোপিত অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলো।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বিদ্যমান মোস্ট ফেভার্ড নেশন (এমএফএন) শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ৮৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৭টি দেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কস্তরে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশও এ তালিকায় থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রফতানি বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অক্ষুণœ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্য দিকে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রফতানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে। ফলে এসব দেশের তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরো বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ দিকে, ইউএসটিআর বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ) চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও বস্ত্র উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০১ ধারার অতিরিক্ত শুল্ক মওকুফ করা হতে পারে।

এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা আরো একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবেন। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রফতানি সম্প্রসারণেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রাখা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ রফতানি খাতগুলোর টেকসই প্রবৃদ্ধি, নীতিমালা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ সরকার।

৬০ দেশের ওপর ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপ

আলজাজিরা জানায়, সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি পরাজয়ের পর ঘোষিত সাময়িক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথেই বিশ্বের ডজনখানেক বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের ওপর নতুন করে দুই অঙ্কের শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির ৯৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা ৬০টি দেশ থেকে আসা পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন আমদানি শুল্ক বসাতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। এসব দেশ বাধ্যতামূলক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা সঠিকভাবে কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিশন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে জানান, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাধ্যতামূলক শ্রমের তৈরি পণ্য আমদানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদেরও এই পথ অনুসরণ করা উচিত। এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বৈষম্যমূলক বাণিজ্য চর্চা রোধ করে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে। ওয়াশিংটন ডিসির সময় অনুযায়ী শুক্রবার রাত ১২:০১ মিনিটে (০৪:০১ জিএমটি) সাময়িক ১০ শতাংশ বিশ্বব্যাপী শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই নতুন শুল্ক কার্যকর হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের পূর্ববর্তী শুল্কনীতি বাতিল করলে তিনি ১৫০ দিনের জন্য এই সাময়িক শুল্কের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এবার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ৩০১’-এর অধীনে এই টেকসই শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে, যা প্রেসিডেন্টকে অন্যায্য বা বৈষম্যমূলক বাণিজ্য নীতি গ্রহণকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার আইনি এখতিয়ার দেয়। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে চীনের ওপর শুল্ক আরোপ করতেও এই আইন ব্যবহার করেছিলেন, যা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে টিকে গিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক বাজার ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি

উচ্চ শুল্কের মাধ্যমে মার্কিন উৎপাদন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বহু দশকের মুক্ত বাণিজ্য ও কম শুল্ক নীতি উল্টে দিয়েছেন। এর আগে তিনি ১৯৭৭ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ) ব্যবহার করে দেশের বাণিজ্য ঘাটতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এবং প্রায় সব দেশের আমদানির ওপর দুই অঙ্কের শুল্ক বসিয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, এই আইনে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নেই, যার ফলে সরকারকে আমদানিকারকদের শুল্কের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হতে হয়। পরবর্তীতে ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ১২২’-এর অধীনে ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ সাময়িক শুল্ক চালু করেন, যার মেয়াদ শুক্রবার পূর্ণ হচ্ছে। সেই মেয়াদোত্তীর্ণ শুল্কের স্থলাভিষিক্ত করতেই ‘সেকশন ৩০১’-এর অধীনে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর ইতোমধ্যে আরো ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে নতুন তদন্ত শুরু করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির ৭০ শতাংশ সরবরাহ করে। এসব দেশ অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে দাম কমিয়ে দিয়ে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অসুবিধায় ফেলছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে ‘সেকশন ৩০১’-এর অধীনে আরো শুল্ক আসতে পারে। বেকার ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর ট্যাক্স অ্যান্ড বাজেট পলিসির পরিচালক জন ডায়মন্ড মনে করেন, সাময়িক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রশাসন নতুন আইনি কাঠামোর খোঁজে ‘সেকশন ৩০১’ বেছে নিয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ৬০টিরও বেশি প্রধান বাণিজ্যিক দেশ বাধ্যগত শ্রমের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল- এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন হলেও, আদালত সম্ভবত আগের আইইইপিএ শুল্কের মতো এবার এটি বাতিল করবে না।