‘নিজেকে গুছিয়ে নেবো’ মায়ের সাথে সাংবাদিক প্রিয়’র শেষ কথা

হাবিবুল বাশার
Printed Edition
first-3
‘নিজেকে গুছিয়ে নেবো’ মায়ের সাথে সাংবাদিক প্রিয়’র শেষ কথা

“ঢাকা যাচ্ছি, শিগগিরই নিজেকে গুছিয়ে নেব। তুমি টেনশন নিও না।” বিদায়ের আগে মাকে এ কথাই বলেছিলেন সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়। এটিই ছিল মায়ের সাথে প্রিয়র শেষ কথা। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাজধানীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ১৯ জুলাই ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডে সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে নিহত হন অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য রিপোর্টের ভিডিও সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয় (২৮)। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যা মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

প্রিয়র মা সামসি আরা জামান বলেন, ‘ছেলে ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরায় ছবি ও ভিডিও ধারণে আগ্রহী ছিল। ঘটনার দিন দায়িত্ব পালনে সময় মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। পাশেই হাসপাতাল ছিল, কিন্তু চার দিকে গোলাগুলির কারণে তাকে হাসপাতালে নেয়া যায়নি।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী তানভীর আরাফাত ধ্রুব বলেন, বিকেলে পুলিশ সেন্ট্রাল রোডের দুই দিক ঘিরে গুলি চালাতে শুরু করে। গুলির কিছুক্ষণ আগে তাহির জামান এক সহকর্মীকে বলছিলেন, “যাই হোক, আমরা কিন্তু একসাথে থাকব।” কিছু সময় পরে ১০ থেকে ১২ ফুট দূরে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন ধ্রুব। কয়েকজন এগিয়ে এলেও গুলির কারণে হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয়নি।

সামসি আরা জামান জানান, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতাল ও পরিচিতজনের কাছে খোঁজ করেও ছেলের সন্ধান পাননি। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার লাশ শনাক্ত করা হয়। তার অভিযোগ, লাশ নিতে গিয়ে পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ, ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। সাংবাদিকদের সহযোগিতায় ময়নাতদন্ত শেষে ২০ জুলাই লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তার দাবি, দাফনের পরও পরিবারের আতঙ্ক কাটেনি। গভীর রাতে পুলিশ, র‌্যাব ও সাদা পোশাকধারীরা বাড়িতে তল্লাশি চালায়, গেট ভাঙার চেষ্টা করে এবং গুলিও ছোড়ে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত পরিবার আতঙ্কের মধ্যে ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রিয়কে হারানোর বেদনা আজো বহন করছে তার ছোট মেয়ে পদ্ম। সামসি আরা জামান বলেন, ‘পুলিশ দেখলেই সে বলে, তোমরা আমার বাবাকে মেরেছো। আমার প্রিয় বাবা আমার কাছে আসে না। আমার বাবা আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবে।’

গত বছর বড় ছেলে, প্রিয়র সহকর্মী ও সাংবাদিকদের সহযোগিতায় নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেন সামসি আরা জামান। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও অভিযোগ দায়ের করা হয়। তার অভিযোগ, তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য দেয়া হলেও এখনো মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি।

ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে সামসি আরা জামান বলেন, ‘প্রিয় কোনো অপরাধ করেনি। তাকে কেন হত্যা করা হয়েছে। রাষ্ট্র যদি শহীদ পরিবারগুলোর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে, তাহলেই আমরা অন্তত ন্যায়বিচারের আশা করতে পারি।’