টানা ১৩ রাত মার্কিন-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
টানা ১৩তম রাতের মতো ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী। এর মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরো বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সঙ্ঘাত আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। খবর আলজাজিরার
গতকাল শুক্রবার ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, ড্রোন সংরক্ষণাগার, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা-সংক্রান্ত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। সেন্টকমের দাবি, এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য তৈরি করা হুমকি কমিয়ে আনা।
মার্কিন বাহিনী আরো জানায়, সাম্প্রতিক আইআরজিসির হামলার পরও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে এবং মার্কিন সামরিক সহায়তায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করছে। তবে আইআরজিসি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রয়েছে এবং ইরানের সাথে সমন্বয় করেই কেবল নিরাপদে ওই জলপথ ব্যবহার করা সম্ভব।
আলজাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান, কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া খুজেস্তান প্রদেশের রাজধানী আহভাজেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের মেহর বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, খুজেস্তানের আন্দিমেশক ও ওমিদিয়েহ শহরেও যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এ দিকে ইরানের বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের একটি আবাসিক এলাকায় মার্কিন হামলায় অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন বলে দেশটির আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে। হামলার আগে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টা হামলার পর তিনি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
সম্প্রতি ইরান কুয়েতে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালানোর পর ট্রাম্প বলেন, আমি একটি ব্যাপক হামলার কথা ভাবছি, যা আগের যেকোনো হামলার চেয়ে বড় হবে। আমি সিদ্ধান্ত নেয়ার খুব কাছাকাছি আছি। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সামরিক উত্তেজনা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর আগে টানা ১২ রাত ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এসব হামলায় সেতু ও সুড়ঙ্গও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
অন্য দিকে ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ সঙ্কট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিও কার্যত ভেঙে পড়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি গত বুধবার সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে ইরানের অবকাঠামো বা অন্য কোনো স্থাপনায় হামলা হলে তেহরান ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতিতে তার জবাব দেবে। বুধবার রাতের মার্কিন হামলার পর বৃহস্পতিবার ইরান জর্দান, বাহরাইন ও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। আইআরজিসি দাবি করেছে, জর্দান ও কুয়েতে তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং সেগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে। কুয়েতের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলার দায়ও স্বীকার করেছে আইআরজিসি। তাদের দাবি- ইরানের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযানে কুয়েতের ক্যাম্প উদাইরি, দোহা ক্যাম্প এবং ক্যাম্প আরিফজানকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এসব ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর সরঞ্জাম সংরক্ষণাগার, সেনাদের অবস্থান এবং সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘আগ্রাসী শত্রুর’ হামলার জবাব হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একই সাথে সতর্ক করে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে ইরান আরো ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে।
ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হুমকি দেশটির জনগণ ও সশস্ত্রবাহিনীর মনোবল দুর্বল না করে বরং আরো শক্তিশালী করবে। তারা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আরো দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ইরান সতর্ক করে জানায়, নতুন কোনো সামরিক অভিযান বা নতুন যুদ্ধফ্রন্ট খোলার চেষ্টা প্রতিপক্ষের জন্য কৌশলগত ভুল হবে এবং এর পরিণতিতে তারা আরো বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
এর আগে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর ২৪তম ধাপে বাহরাইন ও জর্দানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ‘আরাশ’ ড্রোন দিয়ে হামলার দাবিও করেছিল ইরান। সে সময় বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটির জ্বালানি সংরক্ষণাগার, সরঞ্জাম গুদাম ও সেনাদের আবাসন এলাকা এবং জর্দানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটির বিমান হ্যাঙ্গার, রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও আবাসন এলাকাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে কুয়েত, কাতার বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের সর্বশেষ এসব হামলার দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য বা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ দিকে ইয়েমেনের হাউছি গোষ্ঠী সঙ্ঘাতকে আরো বিস্তৃত করে বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরে দু’টি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। এতে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামও বেড়ে গেছে। তেলবাজার বিপজ্জনক সঙ্কটসীমায় পৌঁছানোর আগেই ট্রাম্পের ইরানকে বোমা মেরে নতি স্বীকার করানোর অভিযান সফল হতে হবে। তা না হলে এর অর্থনৈতিক অভিঘাত নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চীনের কথিত নির্বাচনী কারচুপি নিয়ে যতই কথা বলা হোক না কেন, সেই দায় এড়ানো সম্ভব হবে না।
কিন্তু যুদ্ধের ইতিহাস বলছে, শুধু বোমা হামলার মাধ্যমে খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়। ইরানকে সত্যিকার অর্থে আশাহীন অবস্থায় ঠেলে দিতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এবং সম্ভবত স্থলবাহিনীরও প্রয়োজন হবে। এটি আরেকটি সময়সীমার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও ক্ষেপণাস্ত্র, দুটোই দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসের কাছে আরো অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানাতে গিয়ে ‘গুরুতর ঘাটতির’ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে এই যুদ্ধে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অথচ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তিনি যে অতিরিক্ত ৬৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছেন, তা অনুমোদন দিতে আইনপ্রণেতারা অনীহা দেখাচ্ছেন।
এ দিকে ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। এফ-১৬ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যে এই যুদ্ধমঞ্চে যুক্ত হয়েছে। আরো আকাশে জ্বালানি ভরার ট্যাংকার বিমান ইসরাইলের পথে রয়েছে। পাশাপাশি, অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলার জবাব দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলাবারুদও দ্রুত কমে যাচ্ছে। এসব অস্ত্র পুনরায় মজুদ করতে বহু বছর লেগে যাবে।
অবশ্যই ইরানও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে রয়েছে। তাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদও দ্রুত কমে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় অংশ বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাহলে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দু’টিই অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে।
তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরানের জীবনযাত্রা আগে থেকেই কঠিন ছিল। বিকল্পের সুযোগও খুব সীমিত, ভিন্ন মত প্রকাশের পরিসরও সামান্য। তাই ধরে নেয়া নিরাপদ যে কষ্ট সহ্য করার ক্ষেত্রে ইরানের সীমা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। সময় যত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, ট্রাম্পের সামনে দু’টি পথই ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে : হয় তাকে পিছু হটতে হবে, নয়তো আরো বড় মাত্রায় যুদ্ধ জোরদার করতে হবে। ইরানিদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা যেন তাকে একটি স্থলযুদ্ধে টেনে আনতেই আশাবাদী।