এনসিপির আগ্রাসনবিরোধী যাত্রা

পুরনো বিভাজনের রাজনীতি আবার ফিরে এসেছে : নাহিদ ইসলাম

Printed Edition
back-2
জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতীয় নাগরিক পার্টির শ্রদ্ধা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নের চূড়ান্ত সুরাহা করতে পারিনি। এত বছর পরও আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষের রাজনীতির মুখোমুখি হচ্ছি। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আশা করেছিলাম, এই বিভাজনের রাজনীতি বাংলাদেশ থেকে চিরতরে বিদায় নেবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ৫ আগস্টের পরও সেই পুরনো বিভাজনের রাজনীতি আবার ফিরে এসেছে। যে রাজনীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও মুজিববাদী বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশকে বিভ ক্ত করে রেখেছিল, একটি কৃত্রিম প্রতিপক্ষ তৈরি করে রেখেছিল; সেই রাজনীতি আজও আমাদের পিছু ছাড়েনি।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা মনে করি, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগ্রাসনবিরোধী চেতনার ধারাবাহিকতায় দেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি মহল্লায় ও পাড়ায় আগ্রাসনবিরোধী ও আধিপত্যবাদবিরোধী কমিটি গড়ে তুলতে হবে। নিজেদের ঐক্যকে শক্তিশালী করতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কোনো নির্দিষ্ট লিডারশিপ ছিল না, কিন্তু আমরা সবাই একসাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছি।

গতকাল মঙ্গলবার শাহবাগে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উদ্যোগে ‘আগ্রাসনবিরোধী যাত্রা’ শেষে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে এ বক্তব্য দেন তিনি। বিকেল ৪টায় রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কার্যালয় থেকে যাত্রাটি শুরু হয়। পূর্বনির্ধারিত রোডম্যাপ অনুযায়ী মিছিলটি বাংলামোটর মোড় থেকে কাঁটাবন মোড়, নীলক্ষেত মোড় ও পলাশী মোড় প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘুরে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়।

যাত্রায় এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, প্রধান সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মিছিল চলাকালে নেতাকর্মীরা ‘গণভোটে হ্যাঁ বলি, সংস্কারের সাথে চলি’, ‘মুক্তির মূল সনদ গণভোট গণভোট’, ‘এক হাদির কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা ১৬ ডিসেম্বরকে গভীরভাবে ধারণ করি। মহান বিজয় দিবস আমাদের শুধু উৎসবের দিন নয়, এটি সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের দিন। আজ দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে নানা ধরনের আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপের চেষ্টা চলছে। জনগণের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রক্ষায় আমরা রাজপথে নেমেছি।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আমরাই আমাদের দেশের সীমান্ত রক্ষা করেছি। আমরা আমাদের দেশের মুসলমানদের রক্ষা করেছি, আবার মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়কেও রক্ষা করেছি। ইনশা আল্লাহ, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, যারা ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাদের দমাতে চায়; আমরা আমাদের ঐক্যের শক্তি দিয়েই তাদের প্রতিহত করব।

তিনি বলেন, আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য হলো নির্বাচনের জন্য একটি সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে নির্বাচন বানচালের নানা ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ চাই, আমরা সংস্কারের জোয়ার আনতে চাই এই দেশে। এ কারণে জাতীয় নাগরিক পার্টির যেসব প্রার্থী ইতোমধ্যে মনোনয়ন পেয়েছেন এবং শিগগিরই বাকি আসনগুলোতে মনোনয়ন দেয়া হবে। আমরা আগামীকাল থেকেই মাঠে নামব। শরিফ ওসমান হাদির আকাক্সক্ষা ও চেতনাকে ধারণ করে আমরা জনগণের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যাবো। সংস্কারের পক্ষে, একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আমরা মানুষের সামনে দাঁড়াব।

দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণ। ভারতের দোসররা সেটি মেনে নিতে পারেনি। ভারত নিজস্ব কায়দায় এই বাংলাদেশে একটি পুতুল শাসক বসিয়েছিল। তারা পুতুল রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করেছিল। সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে লালন-পালন করে তারা টানা ১৬ বছর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল।

তিনি বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেমন বাংলাদেশের জনগণ ভারতের পুতুল স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে উৎখাত করেছে; তেমনি বাংলাদেশের গলায় আটকে থাকা দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধেও জনগণ তাদের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়েছে। দিল্লির এই আধিপত্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো সুযোগ আমরা আর দিতে পারি না। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আজ ১৬ ডিসেম্বর নরেন্দ্র মোদি এটিকে ভারতের ‘বিজয় দিবস’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিযুদ্ধ ও সংগ্রামকে ভারতের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করে নরেন্দ্র মোদি বিশ্ব ইতিহাস বিকৃত করেছেন। বাংলাদেশের জন্মের সাথে সম্পর্কিত ইতিহাসের বিষয়ে নরেন্দ্র মোদিকে অবশ্যই তার এ বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।

এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আজকের এই দিনে আমার মা-বোনদের ইজ্জত ও সম্ভ্রম হরণকারী দৃশ্যমান পাকিস্তানি শত্রুকে আমরা বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করেছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য; সেই দৃশ্যমান শত্রু বিতাড়িত হলেও ভারতীয় আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ আজও বাংলাদেশের প্রতিটি রন্ধ্রে রয়ে গেছে। ভারতের গুজরাটের কসাই আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের স্বাধীনতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। একাত্তরে আমরা দৃশ্যমান শক্তিকে পরাজিত করেছি। ২৪ থেকে অদৃশ্যমান শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছে, যা ১৬ ডিসেম্বরসহ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের শেকড় উৎপাটনের মধ্য দিয়েই আমরা বাংলাদেশের চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জন করব।