পিলখানা হত্যার বিচার কি নতুন করে হবে
Printed Edition
বিচারাধীন দুই মামলায়ই তদন্তে ত্রুটি ও দুর্বলতা পেয়েছি : আ ল ম ফজলুর রহমান
নতুন করে বিচার শুরু করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে : মনজিল মোরসেদ
এস এম মিন্টু
বিডিআর বিদ্রোহের সময় হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে তা এখনো স্পষ্ট করেনি। সরকার মনে করছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব:) আ ল ম ফজলুর রহমান যে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন সেটিই ঠিক আছে। তারা সেটা ধরেই পরবর্তী পদপে নেবে। বিডিআর বিদ্রোহের হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়েছে। সেটা এখন আপিল বিভাগে আছে। তবে বারবার সিদ্ধান্তের কারণে মামলায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এ দিকে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার পরও কেন তা প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে গতকাল নয়া দিগন্তের প্রশ্নে স্পষ্টভাবেই জবাব দিয়েছেন তদন্ত কমিশনের প্রধান আ ল ম ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ওই সময় তারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও তা প্রকাশ করা হয়নি। তিনি মনে করেন, হয়তো সময়ের অভাবে বা প্রতিবেদনে সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফট্যানেন্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম ও সদ্য বিদায়ী আইজিপি বাহারুল আলমের নাম থাকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ওই সময় এ দু’জনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তারাও এ ঘটনার সাথে জড়িত।
২০০৯ সালে তৎকালীন বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় বিদ্রোহী জওয়ানদের হাতে সংস্থাটির মহাপরিচালকসহ ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দুই সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিজিবি সদস্য ও পঁাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন।
এ বিষয়ে আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, গত বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে পুরনো তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর কাজ করবে সরকার। এ সিদ্ধান্তে আমি খুশি। কারণ এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিডিআর বিদ্রোহের ব্যাপারে সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করলো। ভারতের সাথে ভবিষ্যতে সম্পর্ক কী হবে তাও পরিষ্কার করলেন তারা।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় ৯২১ জনের মতো ভারতীয় বাংলাদেশে এসেছিল। তার মধ্যে ৬৭ জনের মতো লোকের কোনো হিসাব মিলছে না। তারা কোন দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে, এটা ঠিক বলা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারেও আমরা সরকারকে সুপারিশ করেছি ওই ব্যক্তিরা কোথায়, কেন আসলো সেটা খুঁজে বের করার জন্য। এ বিষয়ে ভারতের কাছে জানতে চাওয়ার জন্য আমরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এটা নিয়ে তখন ভারতের সাথে কোনো যোগাযোগও করেনি, চিঠিও দেয়নি। আর তারা প্রতিবেদন প্রকাশও করেনি। কেন করেনি তারাই বলতে পারবে। তবে আমরা প্রকাশের অনুরোধ করেছিলাম।
তিনি বলেন, আমরা বিচারাধীন যে দু’টি মামলা আছে তা নিয়ে তদন্ত করিনি। আমাদের তদন্ত ছিলো এর নেপথ্যে কারা ছিলো তা বের করা। আমরা তা করেছি। আমরা দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করেছি। এখন সরকার যদি আমরা যাদের দায়ী করেছি তাদের বিচারের আওতায় আনতে চায় তাহলে ফৌজদারি তদন্ত লাগবে। কমিশন হিসেবে আমরা আমাদের তদন্তের পে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ দিয়েছি। কিন্তু বিচারের আওতায় আনতে যে প্রক্রিয়া আছে তা অনুসরণ করতে হবে। তিনি মনে করেন, সরকার সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। কারণ আমাদের কমিশন হয়েছিল সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে। ফলে আদালতের নতুন নির্দেশ ছাড়া এ সরকারের কমিশন গঠনের কোনো এখতিয়ার ছিলো না।
পিলখানা হত্যা দিবসে গত বুধবার ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ উপলে বনানীর সামরিক কবরস্থানে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকার নতুন করে কোনো তদন্ত কমিশন করবে না। যেহেতু জাতীয় একটা স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল। দ ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল। কমিশনের প্রতিবেদন একনজরে যা দেখেছি, তাতে ৭০টির মতো সুপারিশমালা এসেছে, যার অনেকগুলোই বাস্তবায়নাধীন। আর বিচারাধীন যে মামলাগুলো আছে, কিছু আপিল বিভাগে আছে, এ বিচারিক প্রক্রিয়াটা সমাপ্ত করা হবে। এ ছাড়া অন্য যে সুপারিশগুলো আছে, সেগুলোও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
দু’দিন আগে তিনি যে নতুন তদন্ত কমিশন গঠনের যে কথা বলেছিলেন সে ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, আগে পুরো প্রতিবেদন না দেখেই পিলখানা হত্যাকা-ের তদন্ত কমিটি নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছিলাম। এখন তা সংশোধন করলাম।
বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় রাষ্ট্রপরে প্রধান প্রসিকিউটর মো: বোরহান উদ্দিন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারের দিক থেকে নতুন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে মামলা যেভাবে চলছিল সেভাবেই চলবে। নতুন কোনো নির্দেশ আসলে তখন আমরা দেখবো। হত্যা মামলাটি এখন সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগে আছে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ পাননি। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারের সর্বশেষ ধাপে আছে। আর বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটি বিচারে আছে। স্যাগ্রহণ চলছে। এ পর্যন্ত ৩০২ জন স্যা দিয়েছেন। গত বুধবারও আদালতে স্যা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ মামলায় যারা সাী দিয়েছেন তারা বিভিন্ন পর্যায়ে বলেছেন যে বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্যে শেখ হাসিনা, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ আরো অনেকে ছিলেন। আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিলে তাদের মামলায় সম্পৃক্ত করা যায়।
এ মামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকার কনসার্ন। ফলে নতুন কোনো ইন্সট্রাকশন না পাওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলবে। তবে মামলার যেকোনো পর্যায়ে তদন্ত করে নতুন আসামি যুক্ত হতে পারে। এ ব্যাপারে আর মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
তদন্ত রিপোর্টে যা আছে : ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর কমিশন তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মূল সমন্বয়কারী ছিলেন সে সময়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। পুরো ঘটনায় শেখ হাসিনার গ্রিন সিগন্যাল ছিলো। প্রতিবেদনে কিভাবে আলামত নষ্ট করা হয় তারও উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা ও তাপস ছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের নাম এসেছে তদন্তে। এর বাইরে শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব:) মোল্লা ফজলে আকবরকেও দায়ী করা হয়। প্রতিবেদনে সামরিক বাহিনী ও পুলিশের কর্মকর্তাদের নামও আছে।
বিচার কি নতুন করে হবে : অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা তদন্ত কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব:) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, আমরা প্রতিবেদনে বলেছি, যে দু’টি মামলার বিচার চলছে দু’টি মামলায়ই তদন্তে ত্রুটি এবং দুর্বলতা আছে। এখন সরকারের উচিত হবে সে দুর্বলতাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। সেটা করলে নিরপরাধ কেউ যদি শাস্তি পেয়ে থেকে, কাউকে যদি অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে তাহলে তাদের তো মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আর সেজন্য সরকার তদন্ত করাতে পারে। কারণ আমরা মামলার তদন্তে দুর্বলতার কথা বললেও সুনির্দিষ্ট করে বলিনি যে ওই দুর্বলতার কারণে নিরপরাধ কেউ ভিকটিম হয়েছি কি না। সেটা এখন বের করা দরকার।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, সরকার যদি কমিশনের তদন্তের ভিত্তিতে নতুন করে বিচার করতে যায় তাহলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। আসলে বিচার পর্যায়ে আদালত যদি মনে করে পুলিশি তদন্তে কোনো ত্রুটি আছে বা সম্পূরক তদন্ত প্রয়োজন তাহলে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে। সেখানে যদি নতুন কারোর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিচারে যুক্ত করতে পারে। যেটা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় হয়েছিলো। সম্পূরক চার্জশিট দেয়া হয়েছিলো। তবে সেটা করতে হয় বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই। কিন্তু বিডিআর বিদ্রোহের হত্যা মামলার বিচার তো শেষ হয়েছে। এখন আপিল বিভাগে আছে।
তিনি বলেন, বারবার তদন্ত হলে আসামিরা এর বেনিফিট পায়। এখন আসামিরা বলতে পারে নতুন তদন্ত অনুযায়ী বিচার হলে তাদের আগে ছেড়ে দেয়া হোক। এর ফলে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। আর ওই তদন্ত অনুযায়ী যদি বিচার হয় তাহলে যারা কারাগারে আছেন তাদের ঝুলিয়ে রাখা হবে কেন? তাদের আগে ছেড়ে দেয়া হোক। আর সিআরপিসিতে কমিশনের তদন্তের কোনো আইনগত মূল্য নাই। নতুন করে কিছু করতে হলে আদালতের নির্দেশে ফৌজদারি তদন্ত হতে হবে। আর একই হত্যার ঘটনায় তো দু’টি মামলা চলতে পারবে না। এ সব কারণেই কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন তদন্তের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর প থেকে আপত্তি দেয়া হয়েছিলো।