বৈদেশিক সহায়তার ছাড় কমেছে ৩৩ শতাংশ
Printed Edition
- প্রতিশ্রুতিও কমেছে ৩.২৭ শতাংশ
- দায় পরিশোধে চাপ বেড়েছে ১০.৬৬ শতাংশ
- এডিপি বাস্তবায়ন হার মাত্র ২১.৭১ শতাংশ
- প্রতিশ্রুতি নেই জাপান, ভারত, চীন, রাশিয়া ও এআইআইবি’র
হামিদুল ইসলাম সরকার
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় বেলায় দেশে বৈদেশিক সহায়তার ছাড় কমার পাশাপাশি আরো অনেক কিছুই কমেছে। শুধু বেড়েছে বিদেশী ঋণের দায় পরিশোধের চাপ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিদেশীদের অর্থসহায়তার ছাড় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। যেখানে একই সময়ে প্রতিশ্রুতিও ৩.২৭ শতাংশ কমে গেছে। তবে পরিশোধের চাপ ১০.৬৬ শতাংশ বেড়েছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) গতকাল দেয়া সর্বশেষ তথ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। আর পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য হলো প্রথম সাত মাসে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হার ছিল গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ মাত্র ২১.১৮ শতাংশ।
ইআরডির তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল ৯২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এর মধ্যে সর্বোচ্চ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ইউরোপ ১৭২ কোটি ৩০ লাখ ডলার এবং এশিয়ার ১৪১ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
আগের তুলনায় প্রতিশ্রুতি ৩.২৭ শতাংশ কম : চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা এসেছে ২২৭ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছর একই সময়ে ছিল ২৩৫ কোটি আট লাখ ৮০ হাজার ডলার। ফলে প্রতিশ্রুতি কমেছে সাত কোটি ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার বা ৩.২৭ শতাংশ। এ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতিতে অনুদানের পরিমাণ ১৩ কোটি ছয় লাখ ডলার এবং ঋণ ছিল ২১৪ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
প্রতিশ্রুতির বিপরীতে কার কত ছাড় : চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে প্রতিশ্রুতি ছিল ২২৭ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যার বিপরীতে ছাড় হয়েছে ২৬৪ কোটি ১৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এই ছাড় চলতি সময়ের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাড়লেও আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী হলো এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সাত মাসে সংস্থাটি ১২৬ কোটি ৯৭ লাখ ১০ হাজার ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে দিলো ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বিশ^ব্যাংকের আইডিএ প্রতিশ্রুতির ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের বিপরীতে দিয়েছে ৫৫ কোটি ৫৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে আগের দেয়া ওয়াদা থেকে এআইআইবি দুই কোটি ৯১ লাখ ৮০ হাজার ডলার, জাপান ১৮ কোটি ৩৫ লাখ ১০ হাজার ডলার দিয়েছে। ভারতের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। তবে ছাড় করেছে ১১ কোটি ৮৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার। চীনেরও প্রতিশ্রুতি না থাকলেও ছাড় করেছে ২০ কোটি চার লাখ ৫০ হাজার ডলার। রাশিয়াও প্রতিশ্রুতিহীন ৫৭ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার ছাড় করেছে। ভারত, চীন ও রাশিয়া পুরনো প্রতিশ্রুতি থেকে অর্থ ছাড় করেছে। অন্যান্য দাতা দেশ ও সংস্থার দেয়া ৭৩ কোটি ৮৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ছাড় করেছে ৪২ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
অর্থছাড় কমেছে ৩২.৯৩ শতাংশ : চলতি অর্থবছর উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থ ছাড় করেছে মোট ২৬৪ কোটি ১৫ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার, যার মধ্যে অনুদান হলো ২৪ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং ঋণ ২৩৯ কোটি ৬৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছর একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ৩৯৩ কোটি ৮৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। সেখানে অনুদান ছিল ২৭ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং ঋণ ৩৬৬ কোটি ৩৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ফলে গত বছরের তুলনায় অর্থছাড় ৩২.৯৩ শতাংশ কম হয়েছে, যা ১২৯ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
দায় পরিশোধে চাপ ১০.৬৬ শতাংশ : ইআরডি’র জানুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য বলছে, বাংলাদেশকে সুদ ও আসল বাবদ ২৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ১০ হাজার ডলার উন্নয়ন সহযোগীদেরকে পরিশোধ করতে হয়েছে, যার মধ্যে আসল বাবদ ১৭৮ কোটি ৫৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং ঋণের সুদ ৮৯ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। আগের বছর সুদাসলে পরিশোধ করা হয় মোট ২৪১ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। এর মধ্যে সুদ বাবদ ৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং আসল দিতে হয়েছে ১৫৪ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পরিশোধ ২৫ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ডলার বা ১০.৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
এডিপির বাস্তবায়ন হার ৫ বছরের নিম্নে : অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন গত সাত মাসে আরো কমেছে। এই সাত মাসে বাস্তবায়ন হার মাত্র ২১.১৮ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ২৭.১১ শতাংশ।
আইএমইডির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছর এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ৩৮ হাজর ৬৯৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আর অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২১.১৮ শতাংশ। গত অর্থবছর একই সময়ে খরচ হয়েছিল ৫৯ হাজার ৮৭৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২১.৫২ শতাংশ। আওয়ামী সরকারের আমলে ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয় ৭১ হাজার ৫৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩০.২১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা ও ইআরডি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের কারণে দাতাদের প্রকল্প ভিত্তিক অর্থ ছাড়ে ভাটা পড়ে। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন হারও গত সাত মাসে আগের পাঁচ বছরের তুলনায় সর্বনিম্নে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতির উপর নির্ভর করে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড়। তবে এখন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। এখন উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় ও প্রতিশ্রুতি বাড়তে পারে।