সানজু স্যামসনের প্রত্যাবর্তনের গল্প

Printed Edition

আশিকুর রহমান

কেরালার ছোট্ট শহর পুল্লুভাজির ভোরগুলো অন্য রকম। নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো যখন মাটিতে পড়ে, তখনই এক কিশোর হাতে ব্যাট নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। তার চোখে ছিল একটাই স্বপ্ন। এক দিন দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে। সেই কিশোরই আজকের সানজু স্যামসন

জাতীয় দলে থেকেও বারবার অবেহেলার শিকার হয়েছেন এ ব্যাটার। বিশ্বকাপে দলে থেকেও শেষ তিন ম্যাচে সুযোগ পাননি। অবশেষে যখন সুযোগ পেলেন তখন প্রায় দুই শতাধিক রান তাড়ার চাপ ভারতের মাথায়। জয়ী হলে সেমিতে অন্যথায় বিদায়। এই রান তাড়ার চাপে সব থেকে শান্ত ও পরিপক্ব ইনিংসগুলোর একটি খেলে ভারতকে টি-২০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিয়ে যান এ তিনি।

চাপের মুহূর্তে কোনো অস্থিরতা নয় বরং পরিকল্পিত শট নির্বাচন, ফাঁক খুঁজে বাউন্ডারি আর প্রয়োজন মতে স্ট্রাইক রোটেশন সব মিলিয়ে এটি ছিল দায়িত্বশীল ও পরিণত এক ইনিংস যা ভারতকে সেমিফাইনালের পথ খুলে দেয়। তার ৯৭ রানের অপরাজিত ইনিংসে ভর করে কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পাঁচ উইকেটের জয় পায় স্বাগতিক ভারত।

আজকের তারকা ক্রিকেটার সানজু স্যামসনের পথচলাটা সহজ ছিল না। ১৯৯৪ সালের ১১ নভেম্বর জন্ম নেয়া সানজুর বাবা ছিলেন দিল্লি পুলিশের কনস্টেবল। চাকরির সূত্রে পরিবারকে দিল্লিতে থাকত হয়েছে। সেখানেই ক্রিকেটের শুরু। তবে কিশোর সানজুর ক্রিকেট প্রতিভা ফুটে ওঠে কেরালায় ফিরে আসার পর। ছোটবেলা থেকেই তার ব্যাটিংয়ে ভিন্নতা ছিল নিখুঁত টাইমিং আর স্বচ্ছন্দ স্ট্রোকপ্লের জন্য। স্কুল ক্রিকেটে একের পর এক সেঞ্চুরি করে নজরে আসেন তিনি।

২০১৩ সালে আইপিএলে সুযোগ আসে। রাজস্থান রয়্যালসে যোগ দিয়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ঝলসে ওঠেন তিনি। অভিজ্ঞ বোলারদের বিরুদ্ধে নির্ভীক ব্যাটিং করে সবার নজর কাড়েন। সেই মৌসুমেই ‘ইমার্জিং প্লেয়ার’ পুরস্কার জেতেন সানজু। তার কভার ড্রাইভ, পুল শট আর উইকেটকিপিং সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পরবর্তীতে দলের অধিনায়কত্বও পান, যা তার নেতৃত্বগুণের প্রমাণ।

২০১৯-২০ মৌসুমে বিজয় হাজারে ট্রফিতে অপরাজিত ২১২ রানের ইনিংস খেলে ষষ্ঠ ইন্ডিয়ান ব্যাটার হিসেবে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে দ্বিশতক করেন।

দেশের জার্সি গায়ে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয় ২০১৫ সালে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-২০ সিরিজে অভিষেক হয় তার। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সহজ নয়। কখনো সুযোগ পেয়েছেন, আবার কখনো বাদ পড়েছেন। ধারাবাহিকতার অভাব, কঠিন প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে পথটা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। সমালোচকরা বলতেন, ‘সানজু প্রতিভাবান কিন্তু কেন যেন জমে উঠতে পারেন না।’ কিন্তু তিনি হার মানেননি। প্রতিবার ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে আবার দরজায় কড়া নেড়েছেন।

২০২০-২১ মৌসুমে তার ব্যাট যেন নতুন করে কথা বলতে শুরু করে। আইপিএলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, অধিনায়ক হিসেবে সাহসী সিদ্ধান্ত, সব মিলিয়ে আবার আলোচনায় আসেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও সুযোগ পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। ২০২৩ এর ডিসেম্বরে সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির দেখা পান তার গল্পটা শুধু রান আর রেকর্ডের নয়; এটা মানসিক শক্তির গল্প। বারবার বাদ পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। সানজু মাঠে শান্ত, সংযত। বড় শট খেলেও বাড়াবাড়ি উচ্ছ্বাস নেই। সতীর্থরা বলেন, তিনি দলের ভেতরের মানুষ। চাপের মুহূর্তে ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেন। আন্তর্জাতিক ১৬টি ওডিআই ও ৫৯ টি-২০ খেলা সামসনকে কেরালার বহু তরুণ ক্রিকেটার নিজেদের আদর্শ মানেন।

ইংরেজি সাহিত্যে বিএ করা সানজু স্যামসনের ক্রিকেট ক্যারিয়ার এখনো চলমান। সামনে আরো সাফল্য, হয়তো আরো চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা একটাই- পড়ে গেলে আবার উঠতে হয়। পুল্লুভাজির সেই ভোরের কিশোর আজো যেন মনে মনে বলে, ‘স্বপ্নটা এখনো শেষ হয়নি।’

আগামীকাল টি-২০ বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। পরের দিন সানজু স্যামসনদের সামনে ইংল্যান্ড।