গেটে তালা, ছুটির নোটিশ-‘শিল্পাঞ্চলে অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া’
গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটে ধুঁকছে কারখানা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
কারখানার বন্ধ ফটক, দেয়ালে সাঁটানো ‘স্থায়ীভাবে বন্ধ’ কিংবা ‘অনির্দিষ্টকালের ছুটি’র নোটিশ আর গেটে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মহীন শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর নিয়মিত ছবি এখন এটি। গত দুই বছরে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, বিশ্ববাজারে ক্রয়াদেশ হ্রাস, ব্যাংকঋণের ভার ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের বহুমুখী চাপে সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে অন্তত ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শুধু কারখানার উৎপাদনই থামেনি, হাজার হাজার শ্রমিকের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে পুরো পরিবার।
শিল্প পুলিশ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিভিন্ন খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বন্ধ হওয়া ৪৫৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরী পোশাক খাতের তৈরী পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ১০৮টি, নিটওয়্যার খাতের বিকেএমইএর ৩৫টি, টেক্সটাইল খাতের বিটিএমইএর আটটি এবং রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা সংলগ্ন বেপজা-সংশ্লিষ্ট ১৯টি কারখানা রয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, গাজীপুরে সর্বোচ্চ ১৫৫টি, আশুলিয়ায় ১২৪টি, চট্টগ্রামে ১১৯টি, নারায়গঞ্জে ৩৮টি, ময়মনসিংহে আটটি, কুমিল্লায় সাতটি এবং খুলনায় ছয়টি কারখানা গুটিয়ে নেয়া হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সব কারখানা হুট করে বা একই কারণে বন্ধ হয়নি। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাবে এবং ১৯০টি মালিক পক্ষের তীব্র আর্থিক সঙ্কটে। এ ছাড়া শ্রমিক অসন্তোষ, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি ও কাঁচামাল সঙ্কটের সম্মিলিত কারণে বন্ধ হয়েছে আরো ৫১টি প্রতিষ্ঠান। তবে দেশের কত হাজার শ্রমিক ঠিক কত দিন ধরে বেকার, তার সমন্বিত কোনো সরকারি পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো মেলেনি। তবে কেবল ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিজিএমইএর সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ জন শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে, যার মধ্যে ২৭টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে জানান, তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও তীব্র গ্যাসসঙ্কটে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে মেশিনের চাকা পুরোমাত্রায় না ঘুরলেও কারখানা ভাড়া, শ্রমিকের মূল বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও ব্যাংকঋণের সুদের মতো স্থায়ী ব্যয় আগের মতোই থেকে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমলেও সার্বিক ব্যয় না কমায় মালিকরা তীব্র আর্থিক দেউলিযাত্বের মুখে পড়ছেন।
উৎপাদন হ্রাসের এই বড় প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতেও। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ দশমিক ৫১ শতাংশই পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও জাহাজ নির্মাণসহ নানা উৎপাদনমুখী শিল্পের। বিজিএমইএ জানিয়েছে, বর্তমানে কেবল ব্যাংকিং জটিলতা ও চলতি মূলধনের অভাবে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধুই একজন মালিকের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়া নয়; এর সাথে শ্রমিকের সংসার, স্থানীয় বাজারের স্বাভাবিক কেনাকাটা ও দেশের সার্বিক অর্থনীতি যুক্ত। তিনি মনে করেন, শিল্প টিকিয়ে রাখতে বন্ধ কারখানাকে শুধু নতুন ঋণ দিলেই হবে না; গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক সুদে অর্থায়ন ও শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এমন চরম সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে বন্ধ ও আংশিক চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে দ্রুত উৎপাদনে ফেরাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার অংশ হিসেবে চলতি মূলধন জোগাতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে প্রতি কোম্পানি সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। এর আগে বন্ধ কারখানা চালুর লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। পাশাপাশি ২০২৬ সালে খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধাও চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতিগত সহায়তা ও সময়মতো অর্থায়ন মিললে বন্ধ থাকা এসব কারখানা থেকে অন্তত এক লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
তবে এসব সরকারি উদ্যোগের সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে কত দিন লাগবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারখানা বন্ধের এই সরাসরি প্রভাব এখন সাধারণ শ্রমিকের রান্নাঘরে পৌঁছে গেছে। একের পর এক কারখানায় ঝুলতে থাকা তালা কেবল একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সমাপ্তি নির্দেশ করে না, বরং তা শত শত পরিবারের মাসের শেষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কঠিন সঙ্কেত দেয়। আর সেই সঙ্কটের চরম মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে দেশের শিল্পাঞ্চলের হাজার হাজার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে।