তরী : সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায় এক মানবিক উদ্যোগ
Printed Edition
আমির ফয়সাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ভবনের সামনে বিকেল নামলেই এক অন্যরকম দৃশ্য চোখে পড়ে। খোলা মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকা শিশুরা, হাতে খাতা-কলম, চোখে অপার কৌতূহল। কোথাও ভেসে আসে শিশুদের কণ্ঠে ছড়া, কোথাও অ, আ শেখার উচ্ছ্বাস। এই দৃশ্যের নেপথ্যে যে নামটি নীরবে অথচ দৃঢ়ভাবে আলো ছড়িয়ে চলেছে, সেটি হলো, ‘তরী’।
২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত এই স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়ার প্রত্যয়ে। সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ২৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শান্ত ভাইয়ের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা ‘তরী’ আজ শুধুই একটি সংগঠন নয়, এটি হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এক জীবন্ত আশ্রয়।
‘তরী’র কাসে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শেখানো হয় জীবনের ভাষা। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শায়লা রহমান কান্তা তার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলেন, কলম ধরতে শেখানো বা অক্ষর চেনানোর সময় তাদের চোখে যে আনন্দ আর আগ্রহ দেখেছি, তা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। একটি নতুন অক্ষর শেখা যেন তাদের কাছে নতুন দিগন্ত আবিষ্কার।
তার কাছে ‘তরী’ কেবল পড়ানোর জায়গা নয়, বরং একটি আবেগঘন যাত্রা। দিনের শেষে শিশুদের সমবেত কণ্ঠে গান আর নির্মল হাসি তাকে বুঝিয়ে দেয়, এই সংগঠনটি শিশুদের জন্য স্বপ্ন বোনার এক নিরাপদ ভূমি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সংগঠনে যেখানে সিনিয়র-জুনিয়র বিভাজন স্পষ্ট, সেখানে ‘তরী’ যেন এক ব্যতিক্রম। সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শিখা আক্তার বলেন, তরী সংগঠনে এসে কখনো মনে হয় না কে সিনিয়র, কে জুনিয়র। সবাই এত ফ্রেন্ডলি যে সহজেই মনের ভাব প্রকাশ করা যায়।
দীর্ঘ অসুস্থতা আর ব্যক্তিগত লড়াইয়ের মধ্যেও ‘তরী’ তাঁর জীবনে এনে দিয়েছে প্রশান্তি। তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার শ্রেষ্ঠ অর্জন এই তরী সংগঠনে আসা। শিশুদের কাছ থেকে পাওয়া ছোট্ট উপহার, ফুল, আম কিংবা একটি সরল অনুরোধ, আপু, তুমি প্রতিদিন আসবা এই কথাগুলোই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হ্যাপির কাছে ‘তরী’ মানে পরিবারের বাইরের আরেকটি পরিবার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া তার পথচলা অল্প সময়েই গভীর বন্ধনে রূপ নেয়। তিনি বলেন, আমি শুধু শিশুদের শেখাচ্ছি না, বরং তাদের কাছ থেকেই শিখছি ভালোবাসা, ধৈর্য আর নিঃস্বার্থ আনন্দের প্রকৃত অর্থ। শিশুরা তাকে ডাকেই ‘হ্যাপি আপু’। কেউ কেউ স্পষ্ট করে বলে দেয়, অন্য কেউ নয়, তারা শুধু তার কাছেই পড়তে চায়। হ্যাপি আবেগভরে বলেন, ওরা যখন ছবি এঁকে আনে, ফুল দেয় কিংবা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আপু, আমরা তোমাকে খুব মিস করেছি’, তখন সব কান্তি মুহূর্তেই ভুলে যাই।
পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সেজানের গল্পটিও অনেকটা শিখা আক্তারের মতোই। দীর্ঘ অসুস্থতা, অনিয়মিত উপস্থিতির মাঝেও ‘তরী’ তার কাছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের নাম। তিনি বলেন, শিশুদের নির্মল হাসি আর নিষ্পাপ চাহনি আর কোনো সংগঠনে পাওয়া যাবে না। তার বিশ্বাস, যদি শুরু থেকেই তিনি তরীর সাথে যুক্ত হতে পারতেন, তবে জীবনের অনেক অন্ধকার সময় হয়তো এতটা ভারী লাগত না।
তরী আজ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক মানবিক দৃষ্টান্ত। এখানে শিক্ষা মানে কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়; শিক্ষা মানে বিশ্বাস গড়া, আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া, আর ভালোবাসার চর্চা। এই তরীতে চড়ে স্বেচ্ছাসেবীরা যেমন শিশুদের আলোর পথে নিয়ে যান, তেমনি নিজেরাও ফিরে পান জীবনের গভীর অর্থ।
শিশুদের ছোট্ট কণ্ঠে বলা একটি বাক্য ‘আপু, কাল আবার আসবা?’ এই প্রশ্নেই যেন তরীর অস্তিত্বের সারকথা লুকিয়ে আছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে যদি এমন আরো তরী ভাসতে পারে, তবে অন্ধকারের মাঝেও আলো খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে না। তরী একটি সংগঠন নয়, একটি ভালোবাসার নাম; একটি যাত্রা, যা থামে না।