বিভাগে হাইকোর্টের বেঞ্চ

রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিধান সংশোধনেও একমত রাজনৈতিক দলগুলো

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত কমিশনের বৈঠকে দেশের সব বিভাগীয় শহরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ করার বিষয়ে একমত হয়েছে দলগুলো।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন অধ্যাপক আলী রিয়াজ
ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন অধ্যাপক আলী রিয়াজ | পিআইডি

রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন বিষয়ে একমত হয়ে জুলাই সনদ তৈরির লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফায় ৯ম দিনে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত কমিশনের বৈঠকে দেশের সব বিভাগীয় শহরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ করার বিষয়ে একমত হয়েছে দলগুলো। একইভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বর্তমান বিধান সংশোধনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে। নতুন বিধানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অপরাধীকে ক্ষমা করার সুযোগ থাকবে। এই দু’টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমতে পৌঁছলেও সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ছাড়া, গতকালের বৈঠকে রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে আলোচনার কথা থাকলেও তা হয়নি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো: এমদাদুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. মো: আইয়ুব মিয়া ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।

বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য রয়েছে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য ঐকমত্য হয়েছে। বলা হয়েছে- রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে। তবে রাজধানীর বাইরে সব বিভাগে প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে এক বা একাধিক বেঞ্চ থাকবে। অর্থাৎ হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ ঢাকার পাশাপাশি সব বিভাগীয় শহরে থাকবে। এ বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে।

বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে আলী রীয়াজ আরো বলেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ১৬ বছর বা তার আগে থেকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টির ব্যাপকভাবে অপব্যবহার হয়েছে। সব রাজনৈতিক দল অনুধাবন করেছে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির যে ক্ষমার বিষয়টি আছে তা সংশোধন প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিচারবিভাগ সংস্কার কমিশন থেকে কিছু সুপারিশ ছিল। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে ক্ষমার বিষয় সংবিধানে যুক্ত করার সুপারিশে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি এই বিধি অনুসরণ করে ক্ষমা প্রয়োগ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রদর্শনের জন্য প্রেরণের আগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মতামত নিতে হবে। ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৪৯-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল যে কোনো দণ্ডের মার্জনা বা বিলম্ব, দণ্ড মওকুফ করার অধিকার রাষ্ট্রপতির থাকবে। আইন দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্ষমা প্রয়োগ করা হবে।’ সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানে নতুন আইন যুক্ত হলে বিগত সময়ে রাজনৈতিকভাবে এই আইনের যে অপব্যবহার হয়েছে তা বন্ধ হবে।

আগামী সপ্তাহে নতুন নতুন আরো অনেক বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হবে জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, জরুরি অবস্থা নিয়ে আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু এ বিষয়টি এনসিসির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এখন যেহেতু এনসিসি আলোচনার টেবিলে নেই, তাই আমরা জরুরি অবস্থার বিষয়ে নতুন করে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে হাজির করব। আজকের আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। তিনটি বিষয়ের মধ্য দু’টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। আশা করি আগামী সপ্তাহের মধ্যে অন্যান্য বিষয়ে আমরা অগ্রগতিতে পৌঁছাতে পারব।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষ। এই নাগরিকদের পাশাপাশি তাদের সন্তানরা বিচারের আশায় ঢাকা আসেন। তাদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া, অপেক্ষা করার মতো সুযোগ খুব কম মানুষের আছে। এ অবস্থায় সময় ও জনদাবি অনুযায়ী এটা প্রতিষ্ঠিত যে, বিচার প্রক্রিয়াকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া উচিত। এখানে সবাই একমত হয়েছেন। তবে এখানে ২-৩টি সমস্যার কথাও উঠে আসছে। তা হচ্ছে, বিচার ব্যবস্থাকে ডিসেন্ট্রাল করার ক্ষেত্রে অধিকসংখ্যক বিচারপতি পাওয়া যাবে কি না! বিচারপতিরা ঢাকার বাইরে, এলাকায় যাবেন কি না, পটেনশিয়াল আইনজীবীরা এলাকায় গিয়ে প্র্যাকটিস করবেন কি না?

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে বিচারপতি ও পটেনশিয়াল আইনজীবী হয়তো কম হবে। তবে এই সংখ্যা যদি পাঁচগুণ বাড়িয়ে দিই, তাহলে বিচারপতি রিক্র্যুট করতে হবে। মেধাবী তো আছেই। এখন আইনজীবীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়। এক কক্সবাজারেই কিন্তু শতাধিক আইনজীবী আছেন, যাদের কেউ কেউ ঢাকায় সুপ্রিম কোর্টে ও হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন। সরকার যদি কোর্ট পর্যাপ্ত বাড়িয়ে পর্যাপ্ত বিচারপতি নিয়োগ করে, দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ দেন, তাহলে এ সমস্যা থাকবে না। এজন্য আমরা বাজেট বাড়াতে বলছি। সরকারের তো উচিত মেধাবীদের নিয়োগ করা।

ডা: তাহের বলেন, সবাই দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা একমত হয়েছি যে সংবিধান অনুযায়ী, একই ধরনের কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় সুপ্রিম কোর্ট থাকবে। তবে হাইকোর্টকে ডিসেন্ট্রাল করে বিভাগীয় শহরেও স্থায়ী বেঞ্চকে সম্প্রসারণ করা হবে। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নিঃসন্দেহে এটা একটা বড় অর্জন।

রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত বা অপরাধীকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার বিষয়ে জামায়াতের অন্যতম এ শীর্ষ নেতা বলেন, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার বিষয়ে একটা সীমাবদ্ধতা তৈরিতে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। ইনসাফ ও সুষ্ঠু ন্যায়বিচারের স্বার্থে এটি করা হচ্ছে, ক্ষমার ফাঁকে যেন কোনো দুর্বৃত্ত বা দাগি, কোনো খুনি বা আসামি ছাড়া পেয়ে না যায়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করতে পারবেন তবে সেটা ভুক্তভোগী পরিবারের সম্মতির ভিত্তিতে। এটা আমাদের প্রস্তাব ছিল। অন্যান্য দল এতে সমর্থন দিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি বা কমিটি ক্ষমা করতে পারবেন তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য একটা বডি করা হয়েছে। যে বডির সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করতে পারবেন। কোন কোন ক্রাইটেরিয়ায় ক্ষমা করতে পারবেন তার একটা বিস্তারিত তালিকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধের কারণে যদি শাস্তি হয়, যেমন কারো বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, এই হত্যার বিচার হয়েছে ফাঁসি। এ ক্ষেত্রে কমিটি বা রাষ্ট্রপতি এককভাবে চাইলে ক্ষমা করতে পারবেন না। সেখানে আমরা বলেছি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে অবহিত করতে হবে। কারণ একজনের বাবা খুনের অপরাধে অপরাধীকে অন্য আরেকজন ক্ষমা করতে পারেন না। তবে ভুক্তভোগীর পরিবার ও প্রতিষ্ঠিত ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের সম্মতির ভিত্তিতে ক্ষমা করা যাবে। ন্যায়বিচার ও ইনসাফভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি নতুন ডাইমেনশন। এ সময় জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও হামিদুর রহমান আযাদ উপস্থিত ছিলেন।

ফ্যাসিস্টমুক্ত আদালত চান সালাহউদ্দিন : সংলাপ শেষে ব্রিফিংকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘উচ্চ এবং নিম্ন আদালতে ফ্যাসিস্টদের বহাল রেখে যতই আমরা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা করি না কেন, এর সুবিধাভোগী এরা (ফ্যাসিস্টরাই) হবে। আমাদের পরিষ্কার বক্তব্য, ফ্যাসিস্টমুক্ত হতে হবে উচ্চ এবং নিম্ন আদালত। তারপরে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে কার্যকর হবে। উচ্চ এবং নিম্ন আদালতকে ফ্যাসিস্টমুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের নেতাকর্মী, সাংবাদিকসহ সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে তারা অবৈধভাবে সাজা দিয়েছে। সেই ফ্যাসিস্টদের যেন আমরা রক্ষা না করি, আমরা চাই উচ্চ এবং নি¤œ আদালতে যাতে ফ্যাসিস্টের দোসররা না থাকে।

বিএনপির এ স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, এখন যাদের বিরুদ্ধে বদলি, বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এটা যথেষ্ট নয়। তাদের অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট করে শুধু চাকরি গেলে হবে না, অপরাধের জন্য তাদের বিচারও করতে হবে। যদি আমরা সেটি নিশ্চিত করতে পারি তাহলে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা কার্যকর হবে, তা ছাড়া উচ্চ এবং নিম্ন আদালতে ফ্যাসিস্টদের বহাল রেখে যতই আমরা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা করি না কেন, সেটার সুবিধা এরাই ভোগ করবে। এদের মাধ্যমে যদি বিচারব্যবস্থা কার্যকর হয়, যতই আমরা কড়া আইন করি এটার অপব্যবহার তারাই করবে এবং এখনো করছে। তিনি বলেন, আপনারা দেখবেন, জেলা পর্যায়ে থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের যারা দোসর ছিল, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সব তো ওয়ান/টুতে বেল (জামিন) হয়ে যাচ্ছে। এসব কারা করছে, করছে তো এ ফ্যাসিস্টদের দোসররা।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা বিগত সময় দেখেছি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার যথেষ্ট অপব্যবহার হয়েছে। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিসহ বড় বড় অপরাধ করা আসামিদের ক্ষমা প্রদর্শনের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞের একটা উৎসাহ দেয়া হয়েছে। সেই সেন্টিমেন্টের সাথে একমত পোষণ করে, আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির এ ক্ষমতা প্রয়োগের একটা বিধান আনা যায় কি না এবং আইনি একটা পরামর্শ সভা বা বোর্ড রাখা যায় কি না, এ ছাড়া এর সাথে কোনো ইতিমালা প্রণয়ন করা যায় কি না, কি পদ্ধতি অনুসরণ করেই ক্ষমা প্রদর্শনীর বিষয়টি করা যায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছি, রাষ্ট্রপতির এ ক্ষমতাটা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে গতকালের আলোচনায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, গণ-অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আগামী সোমবার পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা যায়।