স্বজনদের মাঝে উৎকণ্ঠা
দুবাইয়ের বন্দরে ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ৩১ নাবিক-ক্রু’ মৃত্যু ঝুঁকিতে!
Printed Edition
নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
ভয়াল পরিস্থিতির মুখোমুখি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল আলী বন্দরে আটকা পড়া বাংলাদেশী পতাকাবাহী বিএসসির জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের ৩১ নাবিক-ক্রু। যুদ্ধপরিস্থিতিতেও ৫০০ কোটি টাকার জাহাজ এবং দেড় হাজার কোটি টাকার কার্গো ফেলে গেলে তো দেশের সম্পদকেই ঝুঁকিতে ফেলা হবে। তাই জীবনবাজি রেখেই জাহাজে অবস্থান করছেন এসব নাবিক-ক্রুরা। যদিও সর্বক্ষণ মৃত্যুর মুখোমুখি নাবিক-ক্রুরা আল্লাহর সাহায্যের প্রতীক্ষায় সেখানে দিন কাটাচ্ছেন। গতকাল শুক্রবার সকালেও সেখানকার আকাশে মিসাইল ও ড্রোনের দেখা মিলেছে। জাহাজের ৩১ জন নাবিকের সবাই নিরাপদে থাকলেও এসব নাবিক-ক্রুদের পরিবারের সদস্যরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত শনিবার বাংলাদেশী জাহাজের খুব কাছেই একটি তেল স্থাপনায় বোমা বিস্ফোরণ হয়। এর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই সেখানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ড্রোন ও মিসাইলের ধ্বংসলীলা দেখা যাচ্ছে। বোমা বিস্ফোরণের আতঙ্ক-সতর্কতার মধ্যেই দিন কাটছে তাদের। পরিস্থিতি এমন যে, সকালের সাথে বিকেলের চিত্রের কোনো মিল নেই। এই পরিস্থিতি নিরাপদ ঘোষণা করা হচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেয়া হচ্ছে পরিস্থিতি অস্বাভাবিকতার সতর্কতা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার আগের দিন আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় বাংলার জয়যাত্রা। জাহাজটিতে ৩১ জন বাংলাদেশী নাবিক রয়েছেন। হামলা শুরু হওয়ার পর প্রথমে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তবে গত সোমবার থেকে আবার পণ্য খালাস শুরু হয়। দৈনিক পাঁচ হাজার মে.টন পন্য খালাস করা হচ্ছে। পণ্য খালাস শেষ হতে আরো অন্তত চার দিন লাগতে পারে বলে বিএসসি সূত্রে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুরুতে বাংলাদেশী নাবিক-ক্রুরা খুব বেশি সন্ত্রস্ত ছিল, তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিচ্ছেন তারা।
এ দিকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নাবিক-ক্রু এবং তাদের স্বজনদের দুশ্চিন্তা আরো বেড়েছে। আগামী চার দিনের মধ্যে পণ্য খালাস শেষ হলেও পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। অবশ্য বিএসসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- সিকিউরিটি অ্যাসেসমেন্ট করেই পরবর্তী গন্তব্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য কুয়েত উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, বন্দরটিতে আরো কমপক্ষে ১০০ জাহাজে পণ্য খালাস চলছে। বাংলাদেশী জাহাজটি এখনো আগের ১০ নম্বর জেটিতেই নোঙর করা আছে, ২০০ মিটার দূরে ৯ নম্বর জেটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। বন্দরটিতে জিপিএস ব্লক অবস্থায় আছে বলেও সূত্র জানায়
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক নয়া দিগন্তকে বলেন, নাবিকদের মনোবল ধরে রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হচ্ছে। নাবিকদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে খাবার বিল সাত ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করা হয়েছে। দুবাই পৃথিবীর সব চেয়ে ব্যবসাবান্ধব এলাকা। সেখানেই আছে আমাদের জাহাজটি। জাহাজে ছয় মাসের খাবার মজুদ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, চার মাসের মূল খাবার এবং দুই মাসের শুকনো খাবারের মজুদ আছে। তিনি বলেন, নাবিক ক্রুদের জাহাজের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নইলে জাহাজ এবানডন্ডড ঘোষণা করতে হবে। এটাই জাহাজী লাইফ।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, জাহাজে স্টারলিংকের সংযোগ থাকায় উচ্চ ব্যান্ডউইথ সম্পন্ন যোগাযোগ সুবিধা রয়েছে। ফলে জাহাজে থাকা নাবিক-ক্রুরা তাদের পরিবারের সাথে অনায়াসেই সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে পারছে। এরই মধ্যে জাহাজের মাস্টারের সাথে দফায় দফায় জুম বৈঠক হচ্ছে। যখন প্রয়োজন হয় ভিডিও কলে কথা হচ্ছে। সবাইকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এরপর জাহাজটি কুয়েত গিয়ে সালফার বোঝাই করার কথা রয়েছে। কিন্তু যদি পরবর্তী গন্তব্যে নিরাপদ পরিবেশ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না যায় তবে জেবেল আলী বন্দর ত্যাগের অনুমতি দেয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সব সময়ই আমাদের দুই-তিনটি জাহাজ বিভিন্ন বন্দরে থাকে। ভাগ্যক্রমে এই পরিস্থিতি একটিমাত্র জাহাজ রয়েছে। এটি ছাড়াও বিএসসির মালিকানাধীন আরো ছয়টি জাহাজ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লাইবেরিয়া, পাকিস্তান, সেনেগাল ও রাশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে রয়েছে এবং এগুলো নিরাপদে আছে বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ বাল্ক ক্যারিয়ার ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের মোসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে নোঙর করে। পরদিন শনিবার রাতে জাহাজটির অদূরে মিসাইল হামলা হয়। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বন্দরে জাহাজটির পণ্য খালাস কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ছিল। তবে গত সোমবার বন্দরের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় আবার পণ্য খালাস শুরু হয়।
ইতোপূর্বে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয় বাংলাদেশী জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’। ওই হামলায় জাহাজটির প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান নিহত হন। পরে জাহাজে আটকে পড়া ২৮ বাংলাদেশী নাবিককে উদ্ধার করা হয়।