কারফিউ দিয়ে আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত সালমান-আনিসুলের
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের ‘শেষ করে দেয়ার’ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এমন তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালে বাজানো ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের এক ফোনালাপে আন্দোলন দমন ও কারফিউ জারির বিষয়ে সরাসরি নির্দেশনার অভিযোগ করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় কর্মীদের অভিযানে বহু ছাত্র-জনতা নিহত হন। এ ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠনের আবেদন জানানো হয়েছে। আসামিপক্ষের শুনানির জন্য আগামী ৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। অপর সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ।
শুনানির শুরুতে চিফ প্রসিকিউটর সালমান ও আনিসুলের ব্যক্তিগত দায় তুলে ধরেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের একটি ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয়। ফোনালাপে আন্দোলন দমনে ছাত্র-জনতাকে ‘শেষ করে দেয়ার’ কথা বলতে শোনা যায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে। একই সাথে কারফিউ জারির পরামর্শ দেয়া হয়। কথোপকথনের একপর্যায়ে ‘এগুলো ফোনে বলা উচিত নয়’ বলেও উল্লেখ করা হয়।
ফোনালাপটি শোনানোর সময় আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক একে অপরের দিকে তাকান এবং পরস্পরের সাথে কথা বলেন। একপর্যায়ে তাদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। এরপর চিফ প্রসিকিউটর সুনির্দিষ্ট পাঁচটি অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান ও আনিসুল এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ১৯ জুলাই তারা ফোনে কথা বলেন। ফোনালাপে ‘আজ রাতেই কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দিতে হবে’ এমন বক্তব্য দেয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২২ জুলাই ব্যবসায়ীদের নিয়ে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেন সালমান এফ রহমান। ওই বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জীবন দিয়ে হলেও শেখ হাসিনার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। একই সময়ে আনিসুল হকের নির্দেশে ২৮৬টি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়, যাতে সাড়ে চার লাখ ছাত্র-জনতাকে আসামি করা হয়। এসব ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার ফলে বহু ছাত্র-জনতা প্রাণ হারালেও নির্যাতন বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, সালমান ও আনিসুলের জ্ঞাতসারে ২৩ জুলাই মিরপুরে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। তাদের উসকানিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় বাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালায়।
তৃতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, মারণাস্ত্র ব্যবহারে তারা প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র করেন। এর ফল হিসেবে ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকায় আক্তারুজ্জামান নিহত হন এবং আরো অনেকে আহত হন।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানির ফলে ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এলাকায় আকাশ, সেতু, আলভীসহ ১২ জনকে হত্যা করা হয়। এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জড়িত ছিলেন।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে পরিকল্পনা করেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। তাদের নির্দেশে প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের হামলায় মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় আল-আমিন, আশরাফুল, সাব্বির, রিতাসহ ১৬ জন নিহত হন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সালমান ও আনিসুল ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগই গঠনের আবেদন জানানো হয়। শুনানি শেষে আসামিপক্ষে সময় চান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ৪ জানুয়ারি শুনানির দিন নির্ধারণ করেন।
উল্লেখ্য, গত ৪ ডিসেম্বর সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন, যা শুনানি শেষে আদালত আমলে নেন। এর আগে ১৩ আগস্ট পালানোর সময় তাদের গ্রেফতার করা হয়। এরপর থেকে তারা হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ একাধিক মামলায় কারাগারে রয়েছেন।