হৃদরোগে আক্রান্ত তামিম মাঠ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে

ক্রীড়া প্রতিবেদক
Printed Edition
1st-3
হৃদরোগে আক্রান্ত তামিম মাঠ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে

পরপর দু’বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তামিম ইকবালের। মাঠ থেকেই তাকে নেয়া হয়েছে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে। এনজিওগ্রামে দু’টি ব্লক ধরা পড়েছে। রিং পরানো হয়েছে। সিসিইউতে আছেন। জ্ঞান ফেরার পর পরিবারের সাথে কথা বলেছেন।

বিকেএসপি তিন নম্বর মাঠে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের অষ্টম রাউন্ডে গতকাল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের প্রতিপক্ষ ছিল শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব। সকালে টসের পর মোহামেডানের অধিনায়ক তামিম ইকবাল খান হালকা বুকে ব্যথা অনুভব করলে বিষয়টি দ্রুত দলের ফিজিও ও ট্রেইনারকে জানান। প্রাথমিকভাবে গ্যাস্ট্রিকজনিত সমস্যা মনে হওয়ায় তামিম গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ গ্রহণ করেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সতর্কতার অংশ হিসেবে কিছুক্ষণ পর নিকটতম কেপিজে হাসপাতালে নেয়া হয় এবং চিকিৎসা শেষে তিনি বিকেএসপিতে ফিরে আসেন।

এরপর শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবা হয়। মোহামেডান ক্লাবের ম্যানেজার শিপনের সাথে আলোচনা করে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা যায়। তবে পরিস্থিতি জটিল হলে তাকে ফের নিকটতম কেপিজে হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজে নেয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার হার্টে দু’টি ব্লক ধরা পড়ে। পরপর দু’বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তামিমের। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত এনজিওগ্রাম করা হয় এবং রিং পরানো হয়। বর্তমানে তিনি কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

ম্যাচ রেফারি দেবব্রত পাল সকাল থেকেই দেখেছেন তামিমের অসুস্থতা ও পরবর্তী চিকিৎসা কার্যক্রমের পুরোটা। দুপুরে গণমাধ্যমকে তিনি জানান, আমরা যারা কাছ থেকে দেখেছি, ব্যাপারটা কিন্তু অকল্পনীয়। ক্রিকেটারদের সাথে আমি দীর্ঘদিন কাজ করছি, নিজে ক্রিকেট খেলেছি, কিন্তু এরকম ঘটনা আমার পুরো ক্যারিয়ারে ঘটেনি।

তিনি যোগ করেন, আমাকে মোহামেডানের ম্যানেজার সাজ্জাদ আহমেদ শিপন জানান, হেলিকপ্টার আসছে। সাথে সাথে গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম বিকেএসপির এক নম্বর মাঠের দিকে। হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার পর (তামিমকে বহনকারী) অ্যাম্বুলেন্স গেল, পেছনে আমার গাড়ি ছিল। তখন কোনো কথা বলা তো দূরের ব্যাপার, তামিমের জ্ঞানও ছিল না। অচেতন অবস্থা। আমরা ভড়কে যাই যে, হেলিকপ্টারে তুলব নাকি গাড়িতেই রাখব। তখনকার দৃশ্যটা এরকম, ডালিম ওর বুকে চাপ দিচ্ছিল, ওর মুখ দিয়ে ফেনা পড়ছিল, পালস (নাড়ির স্পন্দন) নাই। পরে ঠিক হলো এখানেই চিকিৎসা নেয়ার।

এনজিওগ্রাম করানোর সময় তামিমের পক্ষ থেকে একজনকে যে স্বাক্ষর করতে হয়েছে, সেটা আমিই করেছি। এর মধ্যে আমি নাফিসের (তামিমের ভাই নাফিস ইকবাল), আকরাম ভাইয়ের (তামিমের চাচা আকরাম খান) ও ফারুক ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, আমাকে স্বাক্ষর করতে। বিসিবি চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরীর সাথে এই হাসপাতালের ডাক্তাররা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন, জানিয়েছেন তামিমকে কী ট্রিটমেন্ট দেয়া হচ্ছে।

নয়া দিগন্তের সাভার প্রতিনিধি বিষয়টি সরেজমিনে অবলোকন করে জানিয়েছেন, কেপিজে হাসপাতালের মেডিক্যাল ডিরেক্টর ড. রাজীব হাসান বলেছেন, তাকে (তামিম) নিয়ে আসা মাত্রই চিকিৎসা শুরু হয়। ঢাকায় নেয়ার প্রস্তুতি থাকলেও পরে অবস্থা জটিল হলে ঢাকা নিয়ে যাওয়া যায়নি। মূলত জটিল অবস্থায় যা চিকিৎসা প্রয়োজন, সবই করা হয়েছে। তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। সেজন্য এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট করা হয়েছে। ড. মারুফ তামিমের এই স্টেন্টিং দক্ষতার সাথে করেছেন। এই ব্লকটা পুরোপুরি দূর হলেও তামিমের জটিল অবস্থা এখনো কাটেনি। আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করছি। আশা করছি তিনি ভালো হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। সবাই দোয়া করবেন।

এ ঘটনার পর হাসপাতালে তামিমকে দেখতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি ফারুক আহমেদ, বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিম আসেন। পরিবারের পক্ষ থেকে হাসপাতালে তামিমের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা, বড় ভাই নাফিস ইকবালসহ অন্যরা উপস্থিত হন।

বিকেএসপির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: আশরাফুজ্জামান বলেন, সকাল ৯টায় মোহামেডান ও শাইনপুকুরের ম্যাচে টস করার পরে তিনি অসুস্থ বোধ করেন। পরে নিজে থেকেই তিনি কেপিজে হাসপাতালে যান। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরে কিছুটা সুস্থ বোধ করার পর জানান এখানে থাকবেন না, গেলে এভারকেয়ারে যাবেন। পরে আবার বিকেএসপিতে ফিরে যান, পরে বিকেএসপিতে ফিরে যাওয়ার পর তিনি আরো বেশি অসুস্থ বোধ করেন। এরপরে তাকে দ্রুত আবার কেপিজেতে নিয়ে আসা হয়। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

তামিম ইকবালের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা : প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর সাথে কথা বলেন।

নিজাম উদ্দিন জানান, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তামিমকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেয়া হয়। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওগ্রাম করা হয়।

তিনি আরো বলেন, বিসিবি তামিমের চিকিৎসকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তামিম ইকবালের স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়মিত অবহিত করা হবে।

তামিম বাংলাদেশের হয়ে ৭০টি টেস্ট, ২৪৩টি ওয়ানডে ও ৭৮টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এ দিকে বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ বিকেএসপি ও কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালের মেডিক্যাল টিমের সময়োপযোগী এবং বিশেষজ্ঞ হস্তক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমরা সব চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তামিমের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, তিনি জাতির কাছে কতটা ভালোবাসা ও প্রশংসার পাত্র। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আমাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করছে এবং তামিমের অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট পাচ্ছে। তিনি বলেন, বিসিবি তার স্বাস্থ্যের ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং হাসপাতালের মেডিক্যাল টিমের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। তামিমের দ্রুত আরোগ্য নিশ্চিত করতে বোর্ড সব ধরনের সহায়তা এবং সহায়তা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিসিবি বিনীতভাবে অনুরোধ করেছেন, ভক্ত ও দর্শকরা যাতে তামিমের অবস্থা সম্পর্কে জানতে হাসপাতালে ভিড় করা থেকে বিরত থাকেন। কারণ এটি হাসপাতালের চিকিৎসা ও পরিষেবাগুলোকে ব্যাহত করতে পারে। পরবর্তী আপডেটগুলো যথাসময়ে মিডিয়ার সাথে ভাগ করা হবে। বিসিবি ও তামিমের পরিবার তার আরোগ্যের জন্য জাতির অব্যাহত প্রার্থনা এবং আশীর্বাদ কামনা করছে। তামিমের অসুস্থতার খবরে গতকাল দুপুরে বিসিবির বোর্ড সভা স্থগিত করা হয়।