ফ্রেন্ডস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এখন বাবুর্চি

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition
khela 3
ব্যাডমিন্টন ক্যাম্পে বাবুর্চির কাজ করছেন হাবিবুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিয়তি-কপাল-দুর্ভাগ্য-অপয়া; যাই বলা হোক না কেন মানবজীবনে এ শব্দগুলো এক অপরের পরিপূরক। এ নিয়েই বাঁচতে হয়, চলতে হয়, এগিয়ে যেতে হয়। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে সাথি মেনেই কাটাতে হয়ে জীবনের মুহূর্তগুলো।

মো: হাবিবুর রহমান। ছিলেন শাহজাহানপুর ফ্রেন্ডস সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কালের পরিক্রমায় তিনি এখন দিনাজপুর অ্যালোরা শাটলার অ্যাকাডেমির হেড বাবুর্চি। ক্যাম্পে থাকা শাটলারদের খাওয়াদাওয়ার পুরো দায়িত্ব তার ওপর।

স্মৃতিচারণ করে হাবিব জানালেন ইউসুফ বিন জামিল কালু, মিলন, মিল্টন, আনোয়ার, হেলাল, কাদের, রানা, মিন্টু, শাহআলাম, বাবুল, রতন, ফজলু, শাহাদাত, জাকির, কবির, আক্তার হোসেনদের সাথে আমার শাহজাহানপুর আমতলায় ছিল নিয়মিত আড্ডা। একদিন কথায় কথায় ওঠে ফুটবল টিম বানানোর কথা। উপস্থিত সবাই সম্মতি দিলে তখন থেকেই কাজ শুরু হয়ে যায়।’

তিনি যোগ করেন, ‘খেলোয়াড় সংগ্রহের মুখ্য ভূমিকায় থাকেন বর্তমান বসুন্ধরা কিংসের সহকারী কোচ সৈয়দ গোলাম জিলানী। ক্লাবের যাবতীয় খরচ টাকা-পয়সা বেশিরভাগই দিতেন ইউসুফ। পাইওনিয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়ে তৃতীয় বিভাগেও চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে ওঠে ফ্রেন্ডস ক্লাব। তবে প্রথম বিভাগে ওঠে রানার্স আপ হয়ে।’

করোনার এক বছর আগে রাজনৈতিক কোন্দলে ক্লাবসহ আরো বাড়িঘর এবং পাঁচ থেকে ছয়শত দোকানপাট ভেঙে দেয় তৎকালীন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় স্থাপনা ভাঙার কারণে কয়েকশ পরিবারে নেমে আসে দুর্দশা। ক্লাবঘর ভাঙায় বিশাল ক্ষতির মুখে পড়ে ফ্রেন্ডস ক্লাব এবং এর সাথে জড়িত থাকা লোকজন। বর্তমানে ঢাকা ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে আছে ক্লাবটি।

হাবিবের কথা, ‘খিলগাঁও মামার দোকানে চাকরি করতাম। তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের শেষ মুহূর্তে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আমাকে ক্লাবের সামনে দোকান দিতে সাহায্য করেন সবাই। দীর্ঘদিন এখানে হোটেলের ব্যবসায় করি। অবশেষে নিঃস্ব হয়ে যাই।’

ক্লাবঘর এবং নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙায় চুপসে যান হাবিব। এরপর করোনায় অবস্থা আরো নাজুক হতে থাকে। আর্থিক অনটনে সন্তানসহ পরিবার পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া দৌলতপুরে। কয়েকমাস পর নিজেও চলে যান। ওয়ালটনের একটি শো-রুমে চাকরিও করেন এক বছর। ২০১০ সালে ফকিরাপুলে ভুলু-লিজার অ্যাকাডেমিতে ব্যাডমিন্টনও খেলেছেন হাবিব। সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মিনহাজ-অহিদুলের সাথেও প্রাকটিস করতেন। সে হিসেবে ব্যডমিন্টনেও একটা পরিচিতি পান। সংসার খরচ চালাতে উপায়ন্তর না দেখে ব্যাডমিন্টনের একটা অ্যাকাডেমিতে বাবুর্চি হিসেবে যোগ দেন। এরপর নানাদিক ঘুরে দিনাজপুর অ্যালোরা শাটলার অ্যাকডেমিতে বাবুর্চি হিসেবে চাকরি করছেন। এক ছেলে রিব্বি হাসান রাব্বিও বিবিএ ফাইনাল দিয়েছে। কর্মসংস্থান হয়নি তার। বিয়েও করেছে। তার ওপর গত ১৮ রমজানে হাবিবের সহধর্মিণী ইন্তেকাল করেছেন। হাবিব জানালেন, ‘কষ্ট লাগে, কিন্তু জীবনধারণের জন্য তো টাকার প্রয়োজন। কোনো কাজই ছোট নয়। বসে থাকলে কে খাওয়াবে, কে দেখবে। করোনার পর থেকে অনেক টাকা ঋণ হয়ে গেছি। লজ্জাও লাগে তাদের সাথে কথা বলতে।’

যার হাত ধরে ফ্রেন্ডস ক্লাবের সাফল্য সেই সৈয়দ গোলাম জিলানীর কথা, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করি ফ্রেন্ডস ক্লাব। তরুণদের নিয়ে শুরু। এ ক্লাবে খেলেছে জাতীয় দলে খেলা হেমন্ত বিশ্বাস, সাদ উদ্দিনের মতো ফুটবলাররা। ২০০১ সালে লিগে অংশ নেয়া শুরু। ফ্রেন্ডস ক্লাবের ত্রাণকর্তা ইউসুফ কালু বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ভাগিনা। সে বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর পর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। ছাত্রলীগ, যুবলীগের পোলাপানরা যখন ক্লাবঘর ভাঙে তখন আমি গিয়েছিলাম। চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। মহসিন, রক্সি, আবু ফয়সাল, মঈন বাবুও ছিল। সে সময় প্রফেশনাল কোচিংয়ে রহমতগঞ্জ ক্লাবের কোচ হওয়ার পর খুব কম সময়ই দিতে পেরেছি। বর্তমানে বসুন্ধরায় সহকারী কোচ হিসেবে যোগ দেয়ার পর তো আরো সময় দিতে পারছি না।

তিনি যোগ করেন, ‘ফ্রেন্ডস ক্লাবকে নতুন করে সাজানোর জন কালু অবশ্য ফোন দিয়েছিলো। তারপরও চেষ্টা থাকবে ক্লাবটিকে দাঁড় করানো।’

হাবিব জানালেন, নতুন করে যদি ফ্রেন্ডস ক্লাব প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে এ খুশির বর্ণনা করার ভাষা আমার থাকবে না। কতশত শ্রম দিয়েছিলাম সবাই মিলে। শুরু করেছি-শেষ দেখেছি- আবার জন্ম নিবে। এ খুশি তো বর্ণনাতীত।