নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্প কাঁচামালে আগাম করের ধাক্কা

১৫০টির বেশি আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে

শাহ আলম নূর
Printed Edition

নতুন অর্থবছর শুরু হতেই আমদানি বাণিজ্যে হঠাৎ এক ধাক্কা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রায় ১৫০টিরও বেশি পণ্যের আমদানিতে ২ শতাংশ হারে আগাম আয়করের (্অ্যাডভান্স ইনকাম ট্রাক্স-এআইটি) কারণে দেশের শিল্পখাত ও সাধারণ মানুষ চাপে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নতুন এই করব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে নতুন অর্থবছর (২০২৫-২৬) এর প্রথম দিন থেকে। এনবিআরের গেজেট নোটিশ অনুযায়ী, প্রায় ২০০টি পণ্যের ‘এইচএস কোড’ অনুযায়ী এই কর আদায় করা হবে। কর প্রযোজ্য হবে খাদ্যদ্রব্য, কৃষিপণ্য, জ্বালানি, কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে। তবে এসব কর সমন্বয়যোগ্য হলেও এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

২০২৫ সালের জুনে জারি হওয়া এক গেজেটের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানায় এনবিআর। এতে বলা হয়, দেশের রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলা ও কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২.০ শতাংশ হারে আগাম আয়কর আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আওতায় পড়েছে তুলা, গম, চাল, ডাল, চিনি, সয়াবিন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, এলপিজি, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিভিন্ন বীজ ও খনিজ উপকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ সব আমদানি পণ্য।

এআইটি মূলত একটি আগাম কর যা পরে বার্ষিক আয়কর হিসেবে সমন্বয়যোগ্য। তবে বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ ব্যবসায়ীর পক্ষে এ কর সমন্বয়ের পদ্ধতিগত জটিলতা অতিক্রম করা কঠিন। ফলে এটি কার্যত ‘অফসেট’ না হয়ে ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ হিসেবেই বিবেচিত হবে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তারা বলছেন কর আদায়ের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও নথিপত্রে ঘাটতির কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এই কর রিফান্ড বা সমন্বয়ের সুবিধা পায় না। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই গিয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের অন্যতম শিল্প সংগঠন বিটিএমএ (বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন) এই সিদ্ধান্তকে ‘পরামর্শহীন ও একতরফা’ বলে সমালোচনা করেছে। সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, এনবিআর আমাদের সাথে বিন্দুমাত্র পরামর্শ না করে কাঁচামালে কর বসিয়েছে, যা শিল্প খাতকে চরম সঙ্কটে ফেলবে। তিনি বলেন, এক দিকে সরকার শিল্প কাঁচামালে শুল্ক ছাড় দিয়ে সহায়তা দিচ্ছে। অন্য দিকে সেই কাঁচামালের আমদানিতে কর আরোপ করে নিরুৎসাহিত করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে দেশীয় শিল্প।

এএনজেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেহুদ জামান খান জিতু নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা শূন্য শুল্কে তুলা আনলেও, এখন ২ শতাংশ এআইটি এর বোঝা নিতে হবে। তার ওপর বিক্রির সময় ১ শতাংশ উৎসে কর দিচ্ছি। এসব অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫ লাখ টাকা উৎসে কর কাটা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিসাব করলে প্রকৃত করদায় হয় কম। ফলে ফেরত না পাওয়া কর ও এআইটি মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশীয় সুতার দাম বেড়ে গেলে তৈরী পোশাক প্রস্তুতকারকরা বাধ্য হয়ে ভারতীয় সুতার দিকে ঝুঁকবে। এতে রফতানি খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ধ্বংস হয়ে যাবে।

এদিকে এনবিআর দাবি করছে, এআইটি একটি সমন্বয়যোগ্য কর হওয়ায় পণ্যমূল্যে এর প্রভাব পড়বে না। বাস্তবে আমদানিকারকরা এই কর মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে চাল, ডাল, তেল, চিনি, গ্যাসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যখন বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ইতোমধ্যেই দ্বিগুণের কাছাকাছি, তখন এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভোক্তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সহনশীলতার বাইরে ঠেলে দিতে পারে।

এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই কর নতুন কোনো বোঝা নয়। যেহেতু এটি সমন্বয়যোগ্য, তাই এটি মূলত একটি সাময়িক প্রক্রিয়া, যা পরবর্তী সময়ে আয়কর হিসেবে হিসাব করা যাবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো কর-ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং যেসব খাত কর দেয় না, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা। ২ শতাংশ কর খুব বেশি কিছু না। যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী, তাদের জন্য এটা সামলানো কঠিন নয় বলে তিনি মনে করেন। বর্তমানে এআইটি এর বিভিন্ন হার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫ শতাংশ, ৩ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ এবং শূন্য। এই হারগুলো পণ্যের ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারকে এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে কর সমন্বয় করা সহজ হয়। অন্যথায় এই কর কার্যত একটি বিক্রয় কর হিসেবে কাজ করবে, যা উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, আমাদের কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। না হলে কর ব্যবস্থাকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হবে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ নয়া দিগন্তকে বলেন, তুলা দেশের পোশাক খাতের একটি প্রধান কাঁচামাল। এটার ওপর কর বসানো মানে প্রতিযোগিতার শুরুতেই দেশীয় শিল্পকে পিছিয়ে দেয়া। আন্তর্জাতিকভাবে এই ধরনের কর প্রথা গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, যখন বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র, তখন মূলধনের ওপর কর চাপানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। বরং রফতানিমুখী শিল্পকে বাড়তি সুবিধা দেয়া উচিত বলে তিনি পরামর্শ দেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ইতোমধ্যে অর্থউপদেষ্টা দফতরে স্মারকলিপি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা এনবিআরের চেয়ারম্যানের সাথে জরুরি বৈঠকে বসবেন এবং প্রয়োজনে প্রধান উপদেষ্টার দফতরেও হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করবেন।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন এআইটি আরোপের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব আদায় বাড়লেও, এই ধরনের আগাম কর দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়লে রফতানির প্রতিযোগিতা কমে যাবে। কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে এবং ভোক্তাপর্যায়ে জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। সরকার যদি ব্যবসায়ীবান্ধব নীতি অনুসরণ করতে চায়, তবে এআইটি নিয়ে এখনই পুনর্বিবেচনার দরকার রয়েছে। শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও জনগণের স্বার্থে ভারসাম্যপূর্ণ রাজস্ব নীতি গ্রহণ সময়ের দাবি বলে তারা মনে করেন।