রিন্টুর হাঁসছানা : মাহমুদুল হাসান মুন্না
Printed Edition
নিমগাছের ঢালে কাকটি বসে আছে। আড়াল থেকে কাকটিকে নিশানা করে গুলতি তাক করল রিন্টু। মার্বেলটি নিক্ষেপ করার মুহূর্তে তার কাঁধে হাতের স্পর্শ পেল। সে চমকে ওঠে পেছনে ফিরে তাকাল। তার দাদু পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। তখনই কাকটি উড়ে চলে গেলো দৃষ্টির বাইরে। দাদুর ওপর রিন্টুর খুব রাগ হলো। রিন্টু কেন কাকটিকে মেরে ফেলতে চায়?
গত মাসেই ছিল রিন্টুর জন্মদিন। এই দিনে অনেক আনন্দ হলো, খানাপিনা হলো, ঘোরাঘুরি হলো। আর রিন্টুও পেল অনেকগুলো উপহার। তবে সবচেয়ে সুন্দর উপহারটি দিয়েছিল তার দাদি। তাকে মিষ্টি একটি হাঁসছানা দিয়েছিলেন তিনি? রিন্টু হাঁসছানাটিকে খুব পছন্দ করেছিল। ছানাটি ছিল খুব তুলতুলে। সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। আঙিনায় ঘুরে বেড়ায় ছানাটি, সেও পিছু পিছু ঘুরতে থাকে। সারাক্ষণ খাবারদাবার দিয়ে ভরিয়ে রাখে। ছোট ছানাটির ছোট পেট, কতইবা খেতে পারে। রিন্টু চায় হাঁসছানাটি তাড়াতাড়ি বড় হোক। সাঁতার কাটুক পুকুরে, জলের ভেতরে ডুব দিয়ে আবার ভেসে উঠুক।
হাঁসছানাটির সাথেই কাটছিল রিন্টুর দিন। সারাদিন হাসিখেলায় মেতে থাকত সে। রিন্টুর মা খেয়াল করলেন ছেলেটি পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে পড়েছে। তাই তিনি রিন্টুকে বেশ বকাঝকাও করলেন। মায়ের বকুনি খেয়ে সে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। তার মা বলে দিয়েছেন জোরে জোরে পড়তে, যেন তিনি রান্নাঘর থেকে পড়ার শব্দ শুনতে পান। রিন্টুও শব্দ করে পড়তে লাগল। এদিকে হাঁসছানাটি আঙিনায় রয়ে গেল। রান্নায় ব্যস্ত থাকা রিন্টুর মাও ছানাটির কথা ভুলে গেলেন। কিন্তু দুষ্ট কাক ভুলল না গোশতের স্বাদ। কোথা থেকে উড়ে এসে বসল জামরুলের ডালে। ছানাটি তখন আঙিনায় একা একা ঘুরতেছিল। কাকের দৃষ্টি পড়ল হাঁসছানার ওপর। একা পেয়ে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল ছানাটিকে।
পড়া শেষে রিন্টু এসে খুঁজতে লাগল ছানাটিকে। পুরো আঙিনা তন্নতন্ন করে খুঁজেও সন্ধান পেল না। কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। মায়ের ওপর তার খুব রাগ হলো।
তার মা বুঝলেন কোনো কাক কিংবা বেজি এসে ছানাটিকে নিয়ে গেছে। তিনি রিন্টুকে আরো সুন্দর দেখে অনেকগুলো হাঁসছানা কিনে দেয়ার কথা বললেন। কিন্তু তার কান্না থামল না, ডুকরে ডুকরে কাঁদছে সে। ছানাটির প্রতি অনেক মায়া ছিল তার।
দুপুর বেলায় রিন্টুদের আঙিনায় কাকটি আবার এলো। কা কা ডাক শুনে রিন্টু বুঝতে পারল তার ছানাটিকে কাকই নিয়ে গেছে? কাকটির প্রতি রিন্টুর খুব রাগ ও ক্ষোভ হলো। সে কাকটিকে শায়েস্তা করার পণ করল। জমানো টাকা দিয়ে দোকান থেকে একটি গুলতি ও কিছু মার্বেল কিনে আনল। হাতের নাগালে পেলে কাককে মেরে ফেলবে সে। তাই গুলতি নিয়ে কাকের পিছু পিছু ছুটল সারা বিকেল।
দাদু রিন্টুকে বললেন, তুমি কাকটিকে মেরে ফেললে কি হাঁসছানা ফিরে পাবে? রিন্টু বলল, ফিরে পাবো না, তবুও আমি কাকটিকে শাস্তি দিতে চাই। দাদু বললেন, তোমার এখন মন খারাপ, মাথায় অনেক রাগ, তাই তুমি এমনটা বলছ। আমার কথা মন দিয়ে শোনো আগে। রিন্টু দাদুর কথায় মনোযোগী হলো। তখন তার দাদু বললেন, আমাকে বল তো তুমি হাঁস-মোরগ রান্না করলে কোন পিসটি খেতে পছন্দ করো? রিন্টু বলল, লেগ-পিস আমার খুব পছন্দ, খেতে বেশ মজা লাগে। দাদু বললেন, তুমি কখন খাবার খাও? রিন্টু বলল, যখন খিদা লাগে তখন খাই।
দাদু বললেন, বেশ, বেশ। তোমার পেট আছে, তাই খিদাও লাগে। এবার আমাকে বলো তো কাকের কি পেট আছে? খিদা লাগে? রিন্টু বলল, হ্যাঁ, দাদু। কাকেরও পেট আছে, খিদাও লাগে। তখন দাদু বললেন, কাকটি হয়তো ক্ষুধার্ত ছিল, তাই তোমার হাঁসছানাটিকে নিয়ে গেছে। তোমার মনে ব্যথা দিয়েছে। এজন্য কি তুমিও কাকটিকে ব্যথা দিতে চাও? এবার রিন্টু বুঝতে পারল তার ভুল ছিল। সে তো এমন করে ভেবে দেখেনি। দাদু আবার বললেন, আমাদের উচিত সবসময় সতর্ক থাকা। নিজেদের অর্থ-সম্পদের খেয়াল রাখা। রিন্টু বলল, মা যদি আমাকে আবার হাঁসের ছানা কিনে দেন, তখন আমি ভালোভাবে খেয়াল রাখব, সতর্ক থাকব। দাদুর কথায় রিন্টুর মনের সব রাগ, ক্ষোভ দূর হয়ে গেল।