বসনিয়ার ফারুকের উপন্যাস
যুদ্ধের কালো ছায়া : আহমদ মতিউর রহমান
Printed Edition
ফারুক সেহিচ একজন বসনিয়ান কবি, ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। তিনি উপন্যাস লিখে সবচেয়ে বেশি নাম করেছেন। ২০০০ সালে কবিতার বই প্রকাশ করে সাহিত্য জগতে যাত্রা শুরু। তার উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গার্ডিয়ানের বুক রিভিউয়ার বলেছেন uiet Flows the Una by Faruk Šehiæ review–‘a major contribution to war literature’-A hypnotic meditation on grief, shame and conflict by a veteran of the Bosnian war ফারুক সেহিচের ‘কোয়াইট ফ্লোস দ্য উনা’ -‘যুদ্ধ সাহিত্যে একটি প্রধান অবদান’-বসনিয়ান যুদ্ধের একজন অভিজ্ঞ সৈনিকের শোক, লজ্জা এবং সঙ্ঘাতের ওপর একটি সম্মোহনী ধ্যান। যুদ্ধ নিয়ে বিশে^ অনেক মহৎ সাহিত্য রচিত হয়েছে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত চলে ইউরোপের একমাত্র মুসলিম দেশ বসনিয়ায় সার্ব আগ্রাসন ও গণহত্যা। লাখো মুসলিম নিহত হন। ফারুকের উপন্যাসে তারই বিবরণ উঠে এসেছে।
তিনি ১৯৭০ সালে বসনিয়া হারজেগোভিনার বিহাচে জন্মগ্রহণ করেন এবং বোসান্সকা ক্রুপায় বেড়ে ওঠেন। বসনিয়ান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি জাগরেবে পশুচিকিৎসা অধ্যয়ন করেন, যেখানে তিনি একজন সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন। যুদ্ধের পর, তিনি সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার প্রথম বই ছিল পজেসমে উ নাস্তাজাঞ্জু (অর্জিত কবিতা, ২০০০) কবিতার একটি সংগ্রহ। তার ছোটগল্পের সংগ্রহ পড প্রিতিসকোম (চাপের নিচে) ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় এবং জোরো ভার্লাগ পুরস্কার জিতে নেয়। আন্ডার প্রেসারের ইংরেজি অনুবাদ ২০১৯ সালের মে মাসে ইস্ট্রোস বুকস দ্বারা প্রকাশিত হয়। তার প্রথম উপন্যাস ‘ক্লিনা ও উনি ’(বসনীয় নাম) ইংরেজি নাম ‘কোয়াইট ফ্লোস দ্য উনা’ (Quiet Flows the Una), ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়। ২০১৬ সালে ইংরেজিতে এবং ২০১৭ সালে ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়। এরপর রোমানিয়ান, বুলগেরিয়ান, তুর্কি, স্প্যানিশ, ম্যাসেডোনিয়ান, আরবি, ডাচ, পোলিশ, স্লোভেনীয় এবং হাঙ্গেরিয়ান ভাষায়ও অনুবাদ করা হয়। ‘কোয়াইট ফ্লোস দ্য উনা’ ২০১১ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় প্রকাশিত সেরা উপন্যাসের জন্য মেসা সেলিমোভিচ পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে সাহিত্যের জন্য ইইউ (ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন) পুরস্কার জিতেছে। তার সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ হলো ‘মাই রিভারস’ ২০১৪ সালে প্রকাশিত। বইটি ২০১৪ সালে সার্বিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, মন্টিনিগ্রো এবং ক্রোয়েশিয়ার সেরা কাব্যগ্রন্থের জন্য রিস্টো রাতকোভিচ পুরস্কার এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার লেখক সমিতি থেকে বার্ষিক পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ‘রিটোর্নো আল্লা ন্যাচুরা’ নির্বাচিত কবিতার জন্য প্রিমিও লেটারারিও ক্যামাইওরে ফ্রান্সেস্কো বেলুওমিনি’ (প্রিমিও ইন্টারন্যাশনাল-২০১৯) পেয়েছেন, যা এখন পর্যন্ত সর্বকনিষ্ঠ বিজয়ী। ২০১৮ সালে তিনি ‘ক্লকওয়ার্ক স্টোরিজ’ নামে একটি ছোটগল্পের সঙ্কলন প্রকাশ করেন। ২০২১ সালে প্রকাশিত হয় আরেকটি উপন্যাস গ্রেটা।
বসনিয়ান কবির আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘কোয়াইট ফ্লোস দ্য উনা’ যুদ্ধ সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। উপন্যাসটি শুরু হয়- ‘আমার স্মৃতিগুলো কুৎসিত এবং নোংরা-এ বাক্য দিয়ে। পাঠকের প্রতিশ্রুতি পরীক্ষা করার মতো, বর্ণনাকারী বলেন যে, তিনি হত্যা করেছেন এবং একাধিকবার। ‘এমন কিছু লোক আছে যারা আমার সাথে এটি ভিন্নভাবে করেছে : যারা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিল যে, তাদের হত্যা করা হোক। কারণ তারা জীবন এবং শক্তিতে পূর্ণ ছিল এবং এটিই তাদের পীড়িত করেছিল- এই ভয় যে তারা তাদের মধ্যে এত ভয়ানক শক্তি নিয়ে বেঁচে থাকবে।’
‘কোয়াইট ফ্লোস দ্য উনা’ হলো একজন ব্যক্তির গল্প, যিনি ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে বসনিয়া ও হারজেগোভিনার যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তিগত আঘাত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। বইটিতে তিনটি সময়কালজুড়ে রয়েছে, যুদ্ধের আগে নায়কের শৈশব, যুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্র এবং সঙ্ঘাত-পরবর্তী সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাওয়ার তার প্রচেষ্টা। তার ধ্যানমূলক গদ্যের মাধ্যমে, সেহিচ এমন একজন ব্যক্তির জীবন পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন যিনি দ্বিমুখী প্রকৃতির; একজন প্রবীণ ও একজন কবি উভয়ই। মাঝে মাঝে তিনি তার জীবনের টুকরোগুলো তুলে ধরতে সক্ষম হন; কিন্তু অন্য সময়ে এটি তার এড়িয়ে যায়। সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিগুলো ‘নোংরা এবং জঘন্য’ যখন তিনি তার বর্তমানকে অসম্পূর্ণ মনে করেন এবং তার পরিচয় অসম্পূর্ণ বোধ করেন। তার স্মৃতির সাহায্যে, তিনি তার মন এবং শক্তি ব্যবহার করে সেই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছেন যেখানে তিনি বন্দী, অতীতের আর্কাইভিস্ট এবং ইতিহাস লেখক উভয়ের ভূমিকায় অভিনয় করছেন- এমন ভূমিকা যা তাকে আবার সবকিছু পুনর্নির্মাণের সুযোগ দেয়। এই গল্পের সমান্তরালে বইটিতে উনা নদীর তীরবর্তী শহরের কিছু অংশ পৌরাণিক এবং স্বপ্নের মতো মাত্রা ধারণ করে। এখানে উপন্যাসটি প্রকৃতি, ঋতু, উদ্ভিদ ও প্রাণীর কাব্যিক বর্ণনায় বিস্তৃত, সেই সাথে ১৯৯২ সালের পরে যা ঘটবে তার দ্বারা এখনো কলঙ্কিত নয় এমন শৈশবের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। বইটি এমন লোকদের জন্য উৎসর্গীকৃত যারা মৃত্যু এবং গণবিধ্বংসীর মুখোমুখি জীবনের শক্তি এবং সৌন্দর্যে বিশ্বাস করেন।
সমালোচকরা বলেন, ফারুক সেহিচ যুদ্ধ এবং তার পরিণতি সম্পর্কে কথা বলার একজন বিপ্লবী শিল্পী। হতাশা ও আশার সহানুভূতিশীল কল্পনার একজন উগ্র দৃষ্টিভঙ্গিবাদী। সেহিচ সারায়েভোতে থাকেন, যেখানে তিনি একজন কলামিস্ট ও সাংবাদিক । তিনি লেখক সমিতি এবং বসনিয়া ও হারজেগোভিনার পেন সেন্টারের সদস্য। তার বই ১৫টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ১৯টি দেশে প্রকাশিত হয়েছে।