বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের গুমে রহস্যের কেন্দ্রে চালকসহ দুই ব্যক্তি

এস এম মিন্টু
Printed Edition
1st 4
বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের গুমে রহস্যের কেন্দ্রে চালকসহ দুই ব্যক্তি

রাজধানীতে একসময় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন চৌধুরী আলম। চৌধুরী আলম ১৯৯৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা ১৩ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপশালী কাউন্সিলর ছিলেন। এর বাইরে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়রও। ২০১০ সালের ২৫ জুন আওয়ামী শাসনামলে ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের গার্মেন্ট গলি থেকে গুম হন চৌধুরী আলম। ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর চৌধুরী আলম গুমের ঘটনায় পরিবার ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগের আমলে প্রথম গুমের শিকার চৌধুরী আলম। তৎকালীন সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রথম এসিড টেস্টের বলি হন চৌধুরী আলম। সেই গুমের পর আওয়ামী সরকার একের পর এক প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ব্যক্তিদের গুম করে হত্যা অথবা আয়নাঘরে রেখে বছরের পর বছর নির্যাতন করে আসছিল।

নিখোঁজের পর থেকে চৌধুরী আলমের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও স্বজনরা মনে করেন এখনো তিনি বেঁচে আছেন। তবে দীর্ঘ ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের গুম রহস্যের কিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। বরং তিনি বেঁচে আছেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে চলে নানা জল্পনা-কল্পনা। অভিযোগ উঠেছে, চৌধুরী আলম গুমের সাথে র‌্যাবের তৎকালীন কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন। পেছনে ছিল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা। অনুসন্ধানে এমনটিই বেরিয়ে আসছে।

অনুসন্ধান বলছে, চৌধুরী আলমকে গুম এবং তৎপরবর্তী সময়ে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার সমন্বয়ক ও সহযোগিতার ভূমিকায় ছিলেন দীপক সাহা ও অসীম চন্দ্র ভৌমিক নামে দুই ব্যক্তি। তাদের দু’জনের ভাষ্যে এবং মামলার তদন্তে গরমিল দেখা যাচ্ছে। গত ১০ জুন বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম ‘গুমের’ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে চৌধুরী আলমের ছেলে আবু সাঈদ চৌধুরী এ অভিযোগ দায়ের করেন।

আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, সে দিন তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী উম্মে জাহান আরজুর বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। বের হওয়ার পর কিছু দূর যেতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী গাড়ি তাকে ঘিরে ধরে তুলে নিয়ে যায়। সাথে গাড়িটিও নিয়ে যায়। পরে গাড়িটি কাওরানবাজারের ওয়াসা ভবনের সামনে ফেলে রাখা হয়। চালক অসীম চন্দ্র ভৌমিক পরিবারের কাছে গুমের খবর দেন। ওই সময় চালক অসীম গুমের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী। তবে রহস্যজনক কারণে মামলা কিংবা চৌধুরী আলম গুমের কোনো তদন্তেই তার নাম-গন্ধ নেই। তার কথাবার্তাও রহস্যজনক।

চৌধুরী আলমের দ্বিতীয় স্ত্রী উম্মে জাহান আরজু বলেন, অসীম ওই দিনের বদলি চালক ছিলেন। তার বাড়ি কোথায় এমনকি ভোটার আইডি তেমন কিছুই তাদের কাছে নেই। তবে দীর্ঘ ১৫ বছর পর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছেন অসীম। তাকে খুঁজে বের করা হয় ঢাকায়। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার। ঢাকায় চাকরি করছেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। এ প্রতিবেদকের কাছে অসীম এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে রাজি নন। তার কথাবার্তাও রহস্যজনক।

জানা গেছে, চৌধুরী আলম গুমের পরবর্তী সময়ে চারজন কর্মকর্তা মামলাটির তদন্ত করেছেন। চারজনের তদন্তের ভাষাই একরকম। তাদের কেউই চৌধুরী আলমের গুম রহস্যের কিনারা করতে পারেননি। তবে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা শাহনুর বারির তদন্তে একটি সূত্র পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, চৌধুরী আলম গুমের পাঁচ দিন আগে তাকে গুলশান এলাকা থেকে গুমের চেষ্টা করা হয়। গুম চেষ্টার সেই ঘটনায় র‌্যাব গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য বিল্লাল জনতার হাতে আটক হন। গুলশান থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। তবে র‌্যাব-১ এর তৎকালীন অধিনায়ক রাশিদুল আলম তাকে ছাড়িয়ে নেন। এ ঘটনায় একটি জিডি করা হয়। তবে জিডিতে বিল্লালকে এসআই বলা হলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন সেনা সদস্য। তার বিস্তারিত পরিচয় চাওয়া হলে র‌্যাব সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেনি।

এ বিষয়ে গুম কমিশনের সদস্য নুর খান লিটন জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই গুমের সাথে জড়িত। তাদের বাঁচাতেই মূলত তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে না সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এ ঘটনায় অন্যতম যার নাম এসেছে সেই বিল্লালকে বের করা গেলেই চৌধুরী আলম গুম রহস্যের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

পরিবার সূত্র জানায়, চৌধুরী আলম গুমের পর দীপক সাহা নামে জনৈক এক ব্যক্তি দ্বিতীয় স্ত্রী উম্মে জাহান আরজু ও তার স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করেন। যিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কর্মকর্তা দাবি করতেন। দীপক সাহা বিশাল অঙ্কের টাকা দিলে চৌধুরী আলমকে উদ্ধার করা সম্ভব বলে জানায়। পরে ৩৫ লাখ টাকা দিলে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তে চৌধুরী আলমকে দেখানো হয়। তবে উদ্ধার করা হয়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, ভারতীয় সীমান্তে চৌধুরী আলম কিভাবে গেলেন। তার সাথে দীপক সাহার যোগাযোগ কিভাবে সেটি নিয়ে এখনো ধূম্রজালে রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে পরিবারটি তাকে উদ্ধারের কথা বলে উম্মে জাহান আরজুকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে সেখানে পরিস্থিতি ঝুঁকিপুর্ণ হওয়ায় তিনি ফিরে আসেন। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক কর্মকর্তা গাজী লিকুর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে দীপক সাহাকে খুঁজে বের করেন। কিন্তু তিনি তাকে উদ্ধারে কোনো ভূমিকা নেননি; বরং বিভিন্ন সময়ে উদ্ধারের কথা বলে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। জানা গেছে, সন্দ্বীপ পত্রিকায় ফটো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন দীপক সাহা। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি মারা গেছেন, এমন খবর ছড়ানো হলেও বাস্তবে এটি সত্য নয় বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন।