দুশ্চিন্তায় হাজারো কৃষক

খাল শুকিয়ে চৌচির, সেচ সঙ্কটে কলাপাড়ার বোরো তে ফেটে যাচ্ছে

Printed Edition
Bangla-2
কলাপাড়ায় সেচের অভাবে ধানক্ষেত ফেটে চৌচির : নয়া দিগন্ত

এইচ এম হুমায়ুন কবির কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজ বোরো ধানের চারা দুলছে। স্বাভাবিক সময়ে এমন দৃশ্য কৃষকের মনে স্বস্তি এনে দিলেও এবার সেই সবুজের মধ্যেও কৃষকদের মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং খাল-নালা শুকিয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলে সেচের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ফলে পানির অভাবে অনেক বোরো েেতর মাটি শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে। দ্রুত সেচের ব্যবস্থা না করা হলে ধানগাছ বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ধানচাষিরা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন দেখা গেছে, কোথাও চারা রোপণের পর জমি শুকিয়ে ফেটে গেছে, কোথাও আবার খাল-নালার তলদেশে কেবল কাদামাটি পড়ে আছে। অনেক খালে এখন আর পানির অস্তিত্বই নেই। কোথাও কোথাও নালার মতো অল্প পানি থাকলেও তা দিয়ে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দূরবর্তী স্থান থেকে পাম্প বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে পানি টেনে এনে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় এবং ঝুঁকি দুটোই বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিন খাল খনন বা পুনঃখনন না হওয়ায় অনেক খাল ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ঘাস-আগাছায় ভরে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় কৃষকরা নিজেরাই নালার ঘাস ও আগাছা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে ভাটির দিকে পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে। তবে এতে খুব বেশি সুফল মিলছে না। উপজেলার নেয়ামতপুর, এলেমপুর, কুমিরমারা ও আশপাশের গ্রামগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। অনেক জমিতে ধানের গাছ বেড়ে উঠলেও পানির অভাবে জমির উঁচু অংশ শুকিয়ে ফেটে গেছে। কোথাও কোথাও ছোট-বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। শুকনো জমিতে ধানের ফাঁকে ঘাস গজাতে শুরু করেছে।

তারিকাটা গ্রামের কৃষক মহিউদ্দিন খান (৫০) জানান, তিনি এবার ১৭ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে কিছু পানি পাওয়া যায়। পরে আর থাকে না। অনেক টাকা খরচ করে ধানের চাষ করি, শেষে যদি পানি না পাই তাহলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠা সম্ভব না।’

একই শঙ্কায় রয়েছেন মুকুল মৃধা। তিনি ছয় বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। নয়ন হাওলাদার চাষ করেছেন আট বিঘা জমিতে। সুখ কুলু চার বিঘা এবং মহাদেব হাওলাদার ১০ বিঘা জমিতে হাইব্রিড বোরোর আবাদ করেছেন। শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত সেচের পানি পাওয়া যাবে কি না সেই আশঙ্কা করছেন সবাই।

নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষকদের জন্য পাখিমারা খালটি বড় মিঠা পানির উৎস। কিন্তু বর্তমানে খালটির তলদেশে সামান্য পানি ছাড়া আর কিছুই নেই। খালটির প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ এরই মধ্যে শুকিয়ে গেছে। ফলে কৃষকরা সেচের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত ৫০ থেকে ৬০ কানি (প্রায় ৫০০ বিঘা) জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। তিনি নিজেও পাঁচ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। খালে পানি না থাকায় উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে পাখিমারা খালের পশ্চিম অংশ থেকে ১২টি পাম্প বসিয়ে পানি আনা হচ্ছে।

দেড় বিঘা জমিতে বোরো চাষ করা কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের পাশের হুআইর্যার খালটা পুরো শুকিয়ে গেছে। তাই আগেই একটি ডোবায় পানি জমিয়ে রেখেছি। এখন সবাই মিলে চাঁদা তুলে পাখিমারা খাল থেকে কিছু পানি আনছি। কিন্তু বৃষ্টি না হলে এই সংরক্ষিত পানি দিয়ে সেচ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। কুমিরমারা গ্রামের কৃষক এনামুল হক বলেন, এলাকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু খালে পানি না থাকায় চাষাবাদে সমস্যা বাড়ছে। এতে অনেক কৃষক পরিবার অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছেন।

উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং সেচ সুবিধা সীমিত থাকায় কিছু এলাকায় পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদ হাসান বলেন, এ বছর কলাপাড়ায় পাঁচ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। গত বছর এ আবাদ ছিল তিন হাজার ৩৮০ হেক্টরে। চাষির সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে নীলগঞ্জ ইউনিয়নে। অনেক কৃষক খালে যে পরিমাণ পানি আছে, তার তুলনায় বেশি জমিতে বোরো আবাদ করেছেন।

তিনি আরো বলেন, কৃষকদের বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করতে উঠান বৈঠক, কৃষক সভা ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। সামনে বৃষ্টিপাত হলে সেচের চাপ অনেকটাই কমে আসবে। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ বলেন, কৃষকদের সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেচের পানি নিয়ে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন নজর রাখছে।

তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, দ্রুত খাল-নালা পুনঃখনন ও পরিষ্কার না করা হলে প্রতি বছরই এ ধরনের সেচ সঙ্কট দেখা দেবে। এতে কৃষকরা বড় ধরনের তির মুখে পড়বেন। তাই খালগুলো দ্রুত খনন করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।