ট্রাইব্যুনালে কাদের-সাদ্দামের ফোনালাপ

জামায়াত-বিএনপি যোগ হইছে মারো না কেন ওদের

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

রাজপথে তখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ। এক দিকে ছাত্র-জনতার প্রস্তুতি ও নতুন কর্মসূচি নির্ধারণের আলোচনা, অন্য দিকে তৎকালীন শাসকদলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসছিল রক্তক্ষয়ী হামলার কড়া নির্দেশনা। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে সরাসরি তাগিদ দিয়েছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এমনকি আন্দোলনে ‘জামায়াত-বিএনপি যোগ হয়েছে’ অজুহাত তুলে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র মারার উসকানিও দেয়া হয় শাসক দলের উচ্চপর্যায় থেকে।

গতকাল বৃহস্পতিবার এ ঘটনায় সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ কল রেকর্ডটি বাজিয়ে শোনায় প্রসিকিউশন। দ্বিতীয় দিনের মতো এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কল রেকর্ডটি দাখিল করা হয়।

প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

ট্রাইব্যুনালে বাজানো কল রেকর্ডে শোনা যায়, দুই মিনিট ১২ সেকেন্ডের ফোনালাপের প্রথমে কল ঢোকার রিং বাজে। কল ধরতেই সালাম দেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। নানা কথা বিনিময়ের পর আন্দোলনকারীদের হামলা করতে উসকে দেন ওবায়দুল কাদের। ২০২৪ সালের ১১ জুলাই দু’জনের এ কথোপকথন হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এসব কথায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন বলেও দাবি তাদের।

পাঠকের জন্য ওবায়দুল কাদের ও সাদ্দাম হোসেনের ফোনালাপের অনুলিপিটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

সাদ্দাম : আসসালামু আলাইকুম।

কাদের : ওয়ালাইকুম আসসালাম, হ্যাঁ।

সাদ্দাম : আসসালামু আলাইকুম।

কাদের : হ্যাঁ, কী অবস্থা?

সাদ্দাম : স্যার, আসসালামু আলাইকুম। স্যার, এই যে আমাদের সমাবেশ মাত্র শেষ করলাম। আর ওদের প্রোগ্রাম চলতেছে। তিন হাজারের মতো স্টুডেন্ট আছে।

কাদের : ওরা কত? ৪টা পর্যন্ত তো।

সাদ্দাম : হ্যাঁ, স্যার। এই যে ৮টা ৩০-এ সংবাদ সম্মেলন করবে, স্যার।

কাদের : কে?

সাদ্দাম : ওই যে আন্দোলনকারীরা।

কাদের : কখন?

সাদ্দাম : ৮টা ৩০ মিনিটে সংবাদ সম্মেলন করবে। সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি মনে হয় ঘোষণা করবে। এই দুই দিন জনসংযোগ করবে। এরপর তারা আলটিমেটাম দেবে।

কাদের : শোনো, পেটাও না কেন? মারো না কেন ওদের?

সাদ্দাম : স্যার, ও যে আমাদের তো।

কাদের : সুযোগ দেও কেন? লিবারেল পাচ্ছো?

সাদ্দাম : স্যার, ওই যে নিষেধ করল আমাদের।

কাদের : তোমরা বললে তো আজকে থেকে হালকা হয়ে যাবে খুব।

সাদ্দাম : জি, স্যার।

কাদের : কই হালকা হইলো?

সাদ্দাম : জি স্যার, জামায়াত আজকে ভালো। বেশি ছিল, স্যার।

কাদের : তা তো কে? লাভ তো। তাহলে কি বললা তোমরা? বাস্তবে কী হচ্ছে? জামায়াত মানে? এখানে জামায়াত আর বিএনপি যোগ হইছে।

সাদ্দাম : আজকে স্যার আসছে স্যার। এই যে ছাত্রদলের নেতারা কিন্তু আসছে তো, যে কারণে জামায়াতটা ওই মানে সেভাবে ইয়ে করছে।

কাদের : এটার কিছু করার নাই?

সাদ্দাম : স্যার, আমরা স্পেসিফিক বললাম। আমরা সিচুয়েশনে হ্যান্ডেল করতে পারবো, স্যার।

কাদের : অ্যাঁ?

সাদ্দাম : মানে, আমরা যদি রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হয়, তাহলে আমরা সেটা করতে পারব। আজকে ধরে যে আমাদের নিষেধ করল। শাহবাগের দিকে যেতে তো আমাদের নিষেধ করল। বারবার ফোন দিয়ে বলল যে, শাহবাগের দিকে, অন্য দিকে আমরা যেন না যাই। মানে ওদের মুখোমুখি যেন না হই। এটাই তো বারবার বলতেছিল।

কাদের : কে?

সাদ্দাম : স্যার, ওই যে আমরা যেন ওদের মুখোমুখি না যাই। এটার জন্য বারবার আমাদের বলতেছিল আজকে।

কাদের : কে বলতেছে?

সাদ্দাম : এই যে ফোন দিয়েছিল সবাই। আমাদের পুলিশ প্লাস বিপ্লব দা-ও যোগাযোগ করছিল।

কাদের : বিপ্লব তো এটা বলার কথা না।

সাদ্দাম : না, এমনি ওই যে পুলিশও যোগাযোগ করতেছিল সব মিলিয়ে। মুখোমুখি হতে একবারে মানা করছিল।

কাদের : হুম।

গত ৪ আগস্ট এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু করে প্রসিকিউশন। যুক্তিতে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ছিল পরিকল্পিত, সুসংগঠিত ও দেশব্যাপী ব্যাপক পরিসরে সংঘটিত একটি ‘সিস্টেম্যাটিক ক্রাইম’। আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় অঙ্গসংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করেছে।

এ মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। আসামিরা সবাই পলাতক।

রাজুর পায়ে গুলি চালায় আনসার সদস্য, পিঠে চালায় পুলিশ

এ দিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মোহাম্মদপুর এলাকায় ৯ জন নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। গত ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি রোডে নিজের চোখের সামনে চাচাতো ভাই রাজু আহম্মেদকে হত্যার করুণ বর্ণনা দেন এই সাক্ষী।

তিনি আদালতকে জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চোখের সামনে রাজু আহম্মেদকে প্রাণ হারাতে দেখেন। তিনি বলেন, রাজুর পায়ে প্রথমে গুলি চালিয়েছিলেন এক আনসার সদস্য। পরে এক পুলিশ সদস্য তার পিঠে গুলি করেন।

মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন তিনি। নিরাপত্তার স্বার্থে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ২৫ বছর বয়সী এই যুবক বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকাল ১০টার দিকে মোহাম্মপুর থানার বাঁশবাড়ি রোডের চানমিয়া হাউজিং ওরিয়েন্টাল কভান ভবনের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেই আমি ও আমার চাচাতো ভাই রাজু। একপর্যায়ে আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরে পুলিশ। আমরা ধাওয়া খেয়ে ভবনটির দ্বিতীয় গেটে অবস্থান নেই। ওই সময় কাছে এসে রাজুকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেন আনসার সদস্য ওমর ফারুক। তার বাঁ পায়ে একটি গুলি করেন তিনি। এরপর রাজুর পিঠের বাঁ দিকে গুলি চালান একজন পুলিশ সদস্য। একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রাজু। আমি তার পায়ের কাছে শুয়েছিলাম।

তিনি বলেন, একপর্যায়ে পুলিশকে ধাওয়া দেন ছাত্র-জনতা। এতে সেখান থেকে সরে যায় পুলিশ। পরে আমি রাজুকে নিয়ে পরিচিত একজনের মোটরসাইকেলে করে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দিকে রওনা হই। পথে আমার কাছে পানি খেতে চান রাজু। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিষয়টি ফোন করে জানালে হাসপাতালে আসেন আমার দুই সহকর্মী। ওই দিন রাত ৯টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে রাজুর লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দেই। যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মোবাইল ফোনে আমাদের হুমকি দিলে ভিন্ন পথে গ্রামের বাড়ির দিকে অগ্রসর হই। ২০ জুলাই গ্রামের বাড়িতে রাজুর জানাজা হয়। পরে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এই সাক্ষী বলেন, ২৮ জুলাই আমি কর্মস্থলে ফিরে এসে কভান ভবন থেকে ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করি। কারণ ভবনটির পাশের ভবনে আমি চাকরি করি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাই যে, পুলিশ ও আনসার সদস্য মিলে রাজুকে নির্মমভাবে গুলি করে। ওই এলাকার কাউন্সিলর আসিফ, রাজিব, বিপ্লব, রাষ্ট্রনরা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান। তারা আমাদের অফিসেও গুলি করেন।

এ সময় চাচাতো ভাই রাজু আহম্মেদের হত্যার বিচার চান সাক্ষী। ওমর ফারুকসহ অন্য যেসব নেতার নির্দেশে গুলি করেছে তাদেরও বিচার চাই।

এ মামলায় ২৮ আসামির মধ্যে গ্রেফতার আছেন চারজন। তারা হলেন- নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক ও যুবলীগকর্মী ফজলে রাব্বি। তাদের গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশুনুল হক, এমএ সাত্তার, তোফায়েল, তারেকুজ্জামান, আরিফুর রহমান তুহিন, আহাদ হোসাইন, মো: ইউনূস, মোল্লা রুবেল, আজিজুল হক, রিয়াজ মাহমুদ, হৃদয়, মাইনুল ইসলাম, শেখ বজলুর রহমান, জহির উদ্দিন, আয়মান, সেন্টু মিয়া ও ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম।