জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস

ভোট হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের ওপর ঐতিহাসিক গণভোটকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস একে দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ‘নির্ধারক সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই ভোট শুধু সরকার গঠনের নয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের ভোট।’

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় প্রচারিত ভাষণে তিনি দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী ও প্রবীণদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের এক ভোট ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে।’

শহীদদের স্মরণ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উল্লেখ : ভাষণের শুরুতেই প্রধান উপদেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, এই আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতাতেই দেশ আজ নতুন গণতান্ত্রিক অধ্যায়ে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।

তার ভাষায়, ‘রাজপথের দাবি আজ ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, এবারের নির্বাচন কোনো ‘নিয়মিত নির্বাচন’ নয়; বরং গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্র সংস্কারের সাংবিধানিক প্রকাশ।

রেকর্ডসংখ্যক অংশগ্রহণ : ৫১ দল, দুই হাজারের বেশি প্রার্থী : প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। তিনি এটিকে রাজনৈতিক বহু মতের ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে দেখেন।

রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি ফলাফল মেনে নেয়া এবং নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান।

তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ বার্তা : ভাষণের বড় অংশজুড়ে ছিল তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে বহু তরুণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ‘ভোটের মুখোশ ছিল, কিন্তু ভোট ছিল না’- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন তাদের প্রথম প্রকৃত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। নারীদের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান থেকে অর্থনীতি- সব ক্ষেত্রেই নারীরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। তাই তাদের অংশগ্রহণ এই নির্বাচনের সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তায় নজিরবিহীন প্রস্তুতি :নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতি’ নিয়েছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন- রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন; ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনী; প্রথমবার ব্যাপক পরিসরে সিসিটিভি ক্যামেরা; বডি-ক্যাম ব্যবহার ও ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড মোতায়েন হবে। তার ভাষায়, ‘ভোটার যেন নিরাপদ, সম্মানজনক ও নির্ভয় পরিবেশে ভোট দিতে পারেন- এটাই আমাদের লক্ষ্য।’

প্রবাসীদের ভোটাধিকার ও পোস্টাল ব্যালট : এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশীরা ভোট দিতে পারছেন- এ তথ্য তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস এটিকে গণতন্ত্রের পরিসর বিস্তারের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি ও কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থার কথাও জানান।

গুজব ও অপপ্রচার নিয়ে সতর্কবার্তা : নির্বাচন ঘিরে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তিনি নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। ‘যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার করবেন না’ বলে তিনি ৩৩৩ হটলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। একই সাথে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না এমন প্রচারকে ‘ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার’ বলে আখ্যা দেন তিনি। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট : কেন গুরুত্বপূর্ণ : ভাষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল জুলাই জাতীয় সনদ। তিনি বলেন, ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সাথে দীর্ঘ আলোচনা শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এই সনদ তৈরি করেছে। এটি কোনো একক দলের ইশতেহার নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা।

এই সনদের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন- ‘জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। পরিবর্তনের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকেই।’ গণভোটে অংশ নিয়ে নাগরিকরা জানাবেন- তারা প্রস্তাবিত সংস্কার কাঠামো বাস্তবায়ন চান কি না। ‘ভোট হোক উৎসব’ : শেষ অংশে তিনি নির্বাচনকে উৎসবমুখরভাবে পালনের আহ্বান জানান।

‘ভয় নয়- আশা নিয়ে, বিভক্তি নয়- ঐক্য নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যান,’- বলে তিনি মন্তব্য করেন, ‘এবারের ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।’ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার সরে দাঁড়াবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

রাজনৈতিক তাৎপর্য : বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণটি তিনটি বার্তা স্পষ্ট করেছে-

১. নির্বাচনকে গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপন

২. গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ

৩. শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে শক্ত নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা

ফলে এবারের নির্বাচন ও গণভোট কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদে গণভোট- দুটিই মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দ্বৈত সিদ্ধান্তের দিন। প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান- সবার অংশগ্রহণেই সফল হোক এই গণতান্ত্রিক উৎসব।