নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

নির্বাচন ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের অভিমত

Printed Edition
back-1
নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

দেশীয় পর্যবেক্ষকদের নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোতে প্রশ্ন ছিল, এবারও প্রশ্ন রয়েছে। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ‘একটি ফ্যাক্টর’।

গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে নির্বাচন ও পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জাতীয় নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবেন, এটাই মানুষের বিশ্বাস ও প্রত্যাশা। দেশীয় পর্যবেক্ষকদের নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোতে প্রশ্ন ছিল, এবারও প্রশ্ন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা যদি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ করেন, তাতে তা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। কারণ নির্বাচন একদিনের বিষয় নয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। নির্বাচন শুধু শান্তিপূর্ণ হলেই হবে না। ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধতা যাচাই-বাছাই, ভোট গ্রহণ, ভোট গণনা এবং চূড়ান্তভাবে ফলাফল ঘোষণা- পুরো প্রক্রিয়াটা কারসাজিমুক্ত কি না তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের একটি সমস্যা হলো, তারা বাংলাদেশের অনেক কিছুই বুঝেন না বা জানেন না। এ ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় অংশীদারদের সহযোগিতা নিয়ে থাকেন। কিন্তু স্থানীয়রা অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকেন। এর দ্বারা বিদেশী পর্যবেক্ষকরা প্রভাবিত হতে পারেন।

বিদেশী পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে বড় একটি রাজনৈতিক দলকে দূরে সরিয়ে রাখলেও নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কারণ সবাই চাচ্ছে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আসুক। এর আগে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাপক সমালোচনা করেছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগের সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে এটি অন্যতম একটি কারণ ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, তবে আগের নির্বাচন যে ত্রুটিপূর্ণ ছিল, তা প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সাথে প্রমাণিত হবে, বাংলাদেশ এ ধরনের নির্বাচনই চায়।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ‘একটি ফ্যাক্টর’ মন্তব্য করে মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নির্বাচনেও পর্যবেক্ষকরা তৎপর থাকে। এটা উভয়ের জন্য লাভজনক। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বিভিন্ন দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের প্রত্যয়ন বাংলাদেশের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই বলে আসছে, তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করে দিয়ে যাবে। অনেক মহল থেকে সমালোচনা করা হয়েছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার প্রমাণ করতে পারবে, তাদের মূল এজেন্ডা ছিল বাংলাদেশকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারায় ফিরিয়ে আনা।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়েছে ইইউ। গত ২৯ ডিসেম্বর ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের ১১ জন বিশ্লেষকের সমন্বয়ে গঠিত কোর টিম ঢাকা পৌঁছায়। ১৭ জানুয়ারি ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকের কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে মিশনের তৎপরতা ৬৪ জেলায় সম্প্রসারিত হয়। নির্বাচনের ঠিক আগে মঙ্গলবার ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষককে দেশের কৌশলগত স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতার এই মিশনে ইইউর ২৭টি দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এবারের সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে এসেছেন। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ ছাড়াও কমনওয়েলথ থেকে ২৫ জন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস থেকে ২৮ জন, ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট থেকে ১২ জন এবং অন্যান্য সংস্থা থেকে ৩০ জন পর্যবেক্ষক স্বপ্রণোদিতভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন ভুটান ও নাইজেরিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টির (আইসিএপিপি) স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া তুরস্ক থেকে ছয়জন সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম ইলেকশন কাউন্সিলের কর্মকর্তাসহ ১০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়া থেকে পাঁচজন করে প্রতিনিধিদল এবং ফিলিপাইন, জর্জিয়া, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, জর্দান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান ও ইরানের নির্বাচন কমিশনের কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে এসেছেন।