মেরামত ও সংস্কার : মেয়র হিসেবে মামদানির প্রথম ১০০ দিন
Printed Edition
আলজাজিরা
নিউ ইয়র্কের মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এ সময়টি মূলত শিশু যতœ সংস্কার, রাস্তার গর্ত মেরামত এবং সামর্থ্য অনুযায়ী জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নানামুখী বিতর্কের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। সিটি হলপার্কে হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে হাজার হাজার সমর্থকের উপস্থিতিতে তার অভিষেকের পর প্রায় ১০০ দিন পার হয়ে গেল।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে এ তরুণ ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্টের জয় ছিল ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকের কাছে এটি ছিল একটি বড় পরীক্ষা যে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কি একটি আর্থিক রাজধানী শাসন করা সম্ভব কি না। মেরুকরণের রাজনীতির মাঝে ঐক্য আর সস্তা জীবনযাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মামদানি পরিবর্তনের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।
সিটি হলে আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মামদানি বলেন, এ শহর ও দেশের একমাত্র প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো শ্রমজীবী শ্রেণি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অনেক শ্রমজীবী নিউ ইয়র্কবাসী নিজেদের জীবনসংগ্রামকে রাজনীতির কেন্দ্রে দেখতে পান না। এ বার্তার কারণেই গত বছর ভোটাররা তাকে বিপুল সমর্থন দিয়েছিলেন। ভাড়া বৃদ্ধি, মুদি পণ্যের চড়া দাম এবং শিশু যতেœর ব্যয়বহুল খরচের জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছিলেন তিনি।
তবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাকে তীব্র সমালোচনারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। রিপাবলিকানরা তাকে কমিউনিস্ট বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অনেক নেতাও তাকে চরমপন্থী মনে করেন। চাক শুমার বা হাকিম জেফ্রিজের মতো বড় নেতারা তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
শিশু যতœ এবং গর্ত মেরামত
শত বাধা সত্ত্বেও প্রথম ১০০ দিনে মামদানি কিছু বড় সাফল্য পেয়েছেন। তার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল সবার জন্য শিশু যতœ সুবিধা নিশ্চিত করা। বর্তমানে তিনি নিম্নœ আয়ের এলাকাগুলো থেকে শুরু করে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে দুই হাজার নতুন আসন যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। এর মাধ্যমে নিউ ইয়র্কবাসীদের কাঁধ থেকে ব্যয়বহুল শিশু যতেœর বোঝা নামিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
গভর্নর ক্যাথি হোকুলের সাথে মিলে তিনি ১.২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল নিশ্চিত করেছেন। জুন মাস থেকে দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য আসন বরাদ্দ শুরু হবে। জনপ্রিয়তা পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো শহরের গর্ত মেরামতের অভিযান। এপ্রিলের শুরুতেই শহর কর্তৃপক্ষ এক লক্ষ গর্ত মেরামতের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক
সাফল্যের পাশাপাশি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির তুষারঝড় মোকাবেলায় ধীরগতি এবং বাজেটের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাকে সমালোচিত হতে হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ নিউ ইয়র্কবাসীর আয় দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিকদের ক্ষেত্রে এ হার আরো বেশি। প্রায় পাঁচ মিলিয়ন মানুষ এ কঠিন পরিস্থিতির শিকার। তবে কর বাড়ানোর মাধ্যমে খরচ কমানোর নীতি নিয়ে সবাই একমত নন। কট্টরপন্থীরা মনে করেন যে নিউ ইয়র্কের ধনীদের ওপর ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ কর চাপানো আছে। আর কর বাড়ালে ধনীরা শহর ছেড়ে চলে যেতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক ব্যবসায়ী।
বিদ্বেষ ও পরিচয় সঙ্কট
মেয়র হওয়ার পরপরই ইহুদি ও মুসলিমদের টার্গেট করে বেশ কিছু বিদ্বেষমূলক হামলার ঘটনা ঘটে। জানুয়ারিতে ব্রুকলিনে একটি ইহুদি কেন্দ্রে গাড়ি হামলা এবং মার্চে এক রেডিও টকশোতে মামদানির বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। এমনকি তার সরকারি বাসভবন গ্র্যাসি ম্যানশনের সামনে মুসলিমবিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশও হয়। ১০০ দিন পার হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, মামদানি এখন গর্ত মেরামতের চেয়েও বড় এক যুদ্ধের মুখোমুখি। নিউ ইয়র্ককে একটি সাশ্রয়ী শহর হিসেবে গড়ে তোলার তার স্বপ্ন রাজনীতির কঠিন লড়াইয়ে কতটা টিকে থাকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে মামদানির মতে, গর্ত মেরামতই এই আস্থার লড়াইয়ের একটি ভালো শুরু। কারণ ছোট কাজ ঠিকমতো না করলে মানুষ বড় কাজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না।