নজরকাড়া জয় বাংলাদেশের

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition
1st-4
অর্ধশত রান করা পারভেজ হোসেন ইমন হন ম্যাচ সেরা : নয়া দিগন্ত

শ্রীলঙ্কা সিরিজের দুর্দান্ত ফর্ম দেশের মাঠেও ধরে রাখল বাংলাদেশ। লঙ্কায় প্রথম টি-২০ হারের পর ঘুরে দাঁড়িয়ে সিরিজ জিতে ইতিহাস গড়েছিল। ঘরের মাঠে গতকাল প্রথম টি-২০তে পাকিস্তানকে কোনো পাত্তাই দিলো না লিটন দাসের দল। সফরকারীদের দেয়া ১১০ রান মিরপুর শেরেবাংলায় ২৭ বল বাকি থাকতে সাত উইকেটে জিতে তিন ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে রইল বাংলাদেশ। এ নিয়ে টানা তৃতীয় টি-২০ জিতল টাইগাররা।

বল হাতে রীতিমতো রাজত্ব করল টাইগার বোলাররা। টস হেরে শেষপর্যন্ত পুরো ২০ ওভার খেলতে পারল না পাকিস্তান। শেষ ওভারের প্রথম তিন বলে তিন উইকেট হারিয়ে ১৯.৩ ওভারে ১১০ রানে গুটিয়ে গেল সফরকারীদের ইনিংস। টি-২০তে এই প্রথম বাংলাদেশের বিপক্ষে অলআউট হলো তারা। দুর্দান্ত বোলিং আক্রমণে পাকিস্তানকে দাঁড়াতেই দেয়নি মোস্তাফিজ-তাসকিন-মাহেদীরা। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-২০ বাংলাদেশের বিপক্ষে এটি তাদের সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহ। ২০১৬ সালে মিরপুরেই আগের সর্বনিম্ন ছিল ১২৯/৭।

মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে ফিল্ডিং নেন লিটন দাস। সেই সিদ্ধান্তই হয়ে উঠল জয়ের প্রথম ধাপ। নিয়মিত অধিনায়ক হওয়ার পর আগের ৯টি ম্যাচই খেলেছেন ঘরের বাইরে। কোনো ম্যাচেই টস ভাগ্য হয়নি লিটন দাসের। অবশেষে গতকাল টস জিতেছেন টাইগার অধিনায়ক। আগে ফিল্ডিং বেছে নিয়ে পাকিস্তানকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

ক’দিন আগেই শ্রীলঙ্কা থেকে টি-২০ সিরিজ জিতে এসেছে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে খেলা শেষ দিনের একাদশ থেকে একটি পরিবর্তন এনেছে টাইগাররা। একাদশে ফিরেছেন পেসার তাসকিন আহমেদ। তাকে জায়গা দিতে বাদ পড়েছেন পেসার শরিফুল ইসলাম।

প্রথম থেকেই ধারাবাহিক ও চাপ সৃষ্টি করা বোলিংয়ে উইকেট তুলে নিতে থাকেন তাসকিন-মোস্তাফিজরা। সবচেয়ে বেশি আলো ছড়িয়েছেন কাটার মাস্টার। চার ওভারে দিয়েছেন মাত্র ছয় রান, নিয়েছেন দুইটি মূল্যবান উইকেট-যা আন্তর্জাতিক টি-২০তে বাংলাদেশের হয়ে চার ওভারে সবচেয়ে কম রান দিয়ে বোলিংয়ের নতুন রেকর্ড। এই পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি পেছনে ফেলেছেন রিশাদ হোসেন ও নিজেকেই, যারা আগে চার ওভারে সাত রান দিয়েছিলেন। আগের রেকর্ডেও ছিল মোস্তাফিজের নাম। গত বছর টি-২০ বিশ্বকাপে নেপালের বিপক্ষে চার ওভারে এক মেডেনসহ সাত রানে তিন উইকেট নেন অভিজ্ঞ পেসার। একই ম্যাচে চার ওভারে দুই মেডেনসহ সাত রানে চার উইকেট পান তানজিম হাসান। একই বছর মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে চার ওভারে এক মেডেনসহ সাত রানে এক উইকেট নেন লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন।

এই সংস্করণে এ নিয়ে চার ম্যাচে ১০ রানের কম খরচ করলেন মোস্তাফিজ। বাংলাদেশ তো বটেই, আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যেই পূর্ণ চার ওভার বোলিং করে চার ম্যাচে ১০ রানের কম খরচের রেকর্ড নেই কোনো বোলারের। তিনবার করে ম্যাচে ১০ রানের কম খরচ করেছেন সাকিব আল হাসান, ভুবনেশ্বর কুমার ও ইমাদ ওয়াসিম।

তবে মোস্তাফিজই একা নন, সঙ্গ দিয়েছেন তাসকিন আহমেদ। তিন উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামিয়ে দেন তিনি। শুরুতেই সাইম আইয়ুবকে ফিরিয়ে পথ দেখান। এরপর হারিস, সালমান ও নওয়াজ দ্রুত সাজঘরে ফিরে গেলে পাওয়ারপ্লের মধ্যেই ৪১ রানে চার উইকেট হারায় পাকিস্তান। পাকিস্তানের ইনিংসে একমাত্র প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলেন ওপেনার ফখর জামান। ৩৪ বলে ৪৪ রানের একটি লড়াকু ইনিংস খেললেও এক প্রান্ত আগলে রাখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। যদিও পাঁচ রানে মাহেদীর বলে তাসকিনের ক্যাচ মিসে লাইফ পেয়েছিলেন ফখর। শেষ দিকে খুশদিল শাহ (১৭) এবং আব্বাস আফ্রিদি (২২) কিছুটা লড়ার চেষ্টা করলেও দলীয় সংগ্রহ ১১০ রানের বেশি হয়নি।

শেষ ওভারে নাটকীয় ধস নেমেছিল পাকিস্তানের ইনিংসে। ১৯তম ওভারের চতুর্থ বল পর্যন্ত ১১০ রানে সাত উইকেট ছিল, তাসকিনের করা ২০তম ওভারের প্রথম তিন বলেই পড়ে যায় শেষ তিন উইকেট। একে একে আউট হন ফাহিম আশরাফ, সালমান মির্জা ও আব্বাস আফ্রিদি। বাংলাদেশের হয়ে একটি করে উইকেট নেন শেখ মাহেদী ও তানজিম হাসান সাকিব। বোলাররা একটানা চাপেই রেখেছিল পাকিস্তানকে।

জবাবে খেলতে নামলে অভিষেকে নিজের প্রথম ওভারেই উইকেট পেলেন সালমান মির্জা। তার বাড়তি বাউন্স করা ডেলিভারিতে কথ্যাচ দিলেন তানজিদ হাসান (১)। সালমানের বলে মিড অনে ফাখার জামানের হাতে ধরা পড়েন তানজিদ। চার বলে তিনি করেন এক রান। নিজের দ্বিতীয় ওভারে আরেকটি উইকেট পেলেন সালমান মির্জা। কথ্যাচ দিয়ে ফিরলেন লিটন দাস (১)। তিন ওভারে বাংলাদেশের রান দুই উইকেটে ১৪।

আক্রমণে আসা ফাহিম আশরাফকে ছক্কায় স্বাগত জানাতে চাইলেন তৌহিদ হৃদয়। সেটা করতে গিয়ে আরেকটু হলে আউট হতে বসেছিলেন তিনি। অফ স্টাম্পের বাইরের বল ঠিকঠাক খেলতে পারেননি। ডিপ থার্ড মথ্যানে অনেকটা দৌড়ে এসে বলের নাগাল পেলেও মুঠোয় নিতে পারেননি আবরার আহমেদ। বেঁচে যান ১২ রানে থাকা হৃদয়। ছয় ওভারে স্বাগতিকদের রান ছয় ওভারে দুই উইকেটে ৩৮। পারভেজ হোসেন ইমন ও হৃদয় জুটিতে দলীয় পঞ্চাশ এসেছে ৩৬ বলে। সেই ওভারেই ফিরে যেতে পারতেন এই মিডল অর্ডার বথ্যাটসমথ্যান। কিন্তু লেগ স্পিনারের বলে কথ্যাচ নিতে পারেননি উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ হারিস। ৯ ওভারে বাংলাদেশের রান ২ উইকেটে ৫৯। হৃদয়কে বেশিদুর এগুতে দিলেন না আব্বাস আফ্রিদি। ১২.৩ ওভারে দলীয় ৮০ রানে ৩৭ বলে দু’টি করে চার ছক্কায় ৩৬ রানে সাজঘরে ফিরেন হৃদয়। জয়ের বাকি কাজটা সারেন ইমন ও জাকের আলি। শেষপর্যন্ত ১৫.৩ ওভারে তিন উইকেটে ১১২ রান করে সাত উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ। ইমন ৩৯ বলে তিন চার ও পাঁচ ছক্কায় ৫৬ ও জাকের ১০ বলে তিন চারে ১৫ রানে অপরাজিত থাকেন। সালমান দু’টি ও আব্বাস একটি উইকেট নেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

পাকিস্তান : ১৯.৩ ওভারে ১১০ (ফখর জামান ৪৪, সাইম ৬, হারিস ৪, সালমান আগা ৩, হাসান নাওয়াজ ০, মোহাম্মদ নাওয়াজ ৩, খুশদিল ১৭, আফ্রিদি ২২, আশরাফ ৫, সালমা মির্জা ০, আবরার ০*; মাহেদি ১/৩৭, তাসকিন ৩/২২, তানজিম ১/২০, মোস্তাফিজ ২/৬, রিশাদ ০/১৯)।

বাংলাদেশ : ১৫.৩ ওভারে ১১২/৩ (তানজিদ ১, ইমন ৫৬*, লিটন ১, তৌহিদ ৩৬, জাকের ১৫*, সালমান ২/২৩, আব্বাস ১/১৬)।

ফল : বাংলাদেশ সাত উইকেটে জয়ী।

সিরিজ : তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ তে এগিয়ে।

ম্যাচসেরা : পারভেজ হোসেন ইমন।