হৃদয়ে বিশৃঙ্খলা: মাহমুদুল হাসান নিজামী
Printed Edition
ছোট শহরের সরু রাস্তাগুলোয় সাজিদ প্রতিদিনের মতো কলেজে যেত। চুপচাপ, ভদ্র, নামাজি, পরিবারকে ভালোবাসা- এসব গুণে তার পরিচয় ছিল পরিষ্কার। কিন্তু তার মনের ভেতর ছিল ঝড়ের মতো এক অনুভূতি- এই ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল লামিয়া।
লামিয়া, যার হরিণের মতো চোখে ছিল রহস্য, যার হাসিতে ছিল আলো, আর যার নীরবতায় ছিল অচেনা আকর্ষণ। সাজিদ তাকে দেখে প্রথম দিন থেকেই বুঝেছিল, তার হৃদয় আর আগের মতো থাকবে না।
অন্যদিকে লামিয়াও বুঝত, সাজিদের চোখে তার জন্য এক ধরনের কোমলতা আছে। যখনই সাজিদ তাকে দূর থেকে দেখত, তার চোখে লুকিয়ে থাকত হাজারো অপ্রকাশিত অনুভূতি। কিন্তু মুখে কোনো শব্দই বের হত না।
ওরা দু’জনই দু’জনকে অনুভব করত; কিন্তু কেউই কারো কাছে যেতে পারত না।
ভালোবাসা দূরেই থাকত- অজানা লজ্জা, সঙ্কোচ আর সামাজিক নিয়ম দু’জনের মাঝে বেড়া হয়ে দাঁড়াত।
দেখা হলেও, বলা হতো না কিছুই
কলেজে যখন কোনো অনুষ্ঠান হতো, তারা কাছাকাছি আসত, এক বেঞ্চ দূরে বসত। মাঝে মাঝে চোখে চোখ পড়ত; কিন্তু সেই চোখের ভাষা যেন বুকচিরে বের হতে চাইত না। কেউ কিছু বলত না- শুধু অনুভূতির ঢেউ দু’জনকে অস্থির করে তুলত।
কখনো সাহিত্যিক আড্ডায়, কখনো ক্যাম্পাসের বাগানে, কখনো আবার কোনো গ্রুপ প্রজেক্টের ভিড়ে তারা দুজনই একে অন্যকে ভুল হওয়ার মতো দেখত। কিন্তু যতটা কাছে আসত, ততটাই দূরে চলে যেত।
ভাগ্য যেন তাদের নিয়ে খেলছিল।
বাড়ির আশেপাশে সাজিদের ঘোরাফেরা- একসময় সাজিদ নীরবে লামিয়ার বাড়ির কাছাকাছি যেতে শুরু করল- কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নয়, শুধু তাকে একবার দেখার আকাক্সক্ষা। হয়তো দূর থেকে লামিয়ার জানালার পর্দা একটু নড়তে দেখলেই তার দিনটা ভালো কাটত।
কিন্তু এই নীরব পথে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিপদ- অন্য একতরফা প্রেমিক, আহমেদ।
আহমেদ মনে মনে ভেবেছিল, লামিয়া শুধু তারই। সাজিদের নাম শুনে সে ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে লাগল। ক্রোধে সে অন্ধ হয়ে গেছে।
এক বিকেলে সাজিদ যখন বাড়ি ফিরছিল, তখন রাস্তার মোড়ে আহমেদ তাকে থামাল।
‘তুই লামিয়ার আশপাশে কেন ঘুরিস?’
‘আমি কারো আশপাশে ঘুরি না।’ সাজিদ শান্তভাবে বলল।
কিন্তু আহমেদ শুনল না।
হঠাৎই ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মারধর শুরু করল।
সাজিদ কোনো প্রতিরোধ করল না, শুধু বলল-
‘প্রেম জোর করে পাওয়া যায় না। যার ভাগ্যে যার আছে, সে-ই পাবে।’
এই কথাটি আহমেদকে আরো ক্ষিপ্ত করে তুলল।
সেদিন সাজিদ ভেতরে আঘাত পেলেও বাইরে কিছু প্রকাশ করল না।
আর লামিয়া কিছু জানতে পারল না- তার হৃদয়ের মানুষটি যে তার কারণেই আঘাত পেল।
সময়ের সাথে সাথে লামিয়া নানা দিকে থেকে প্রস্তাব ও আকর্ষণের মুখোমুখি হতে লাগল।
সৌন্দর্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অভিশাপও- এ সত্য সে তখন উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।
অনেক ছেলেই তার প্রতি আকর্ষণ দেখাত। তাদের কেউ কেউ মনে করত তারা-ই লামিয়ার যোগ্য।
এমন পরিস্থিতিতে লামিয়ার মাঝে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়-
কাকে বিশ্বাস করবে? কার কাছে নিরাপদ? কে তাকে সত্যি ভালোবাসে?
তার হৃদয় একদিকে সাজিদের প্রতি টান অনুভব করত, অন্যদিকে চারপাশের প্রশংসার আওয়াজ তাকে বিভ্রান্ত করত।
সে কারো প্রতিও স্পষ্ট কিছু বলতে পারত না।
এই সিদ্ধান্তহীনতা ধীরে ধীরে তাকে ভেতর থেকে হালকা করে দিচ্ছিল।
সাজিদও খেয়াল করল, লামিয়া আর আগের মতো নেই।
তার ভাবনা, তার হাসি, তার চাহনিগুলো যেন অন্য কারো দিকে যাচ্ছে।
এতে সাজিদের হৃদয় ভেঙে যেতে থাকে।
তার রাতগুলো লেগে থাকত নামাজে, দোয়ায়, কান্নায়।
সে বলত-
‘হে আল্লাহ, যদি সে আমার কদরে না থাকে, তবে আমাকে শক্তি দাও তাকে ভুলে যাওয়ার। আর যদি থাকে, তবে সহজ করে দাও।’
ধীরে ধীরে তার মন স্থির হয়ে আসে।
সে নিজের ভবিষ্যতে মন দেয়- অধ্যয়ন, পরিশ্রম ও স্বপ্নে।
কষ্টের সময়ের পর একদিন এলো সাফল্যের আলো।
সাজিদ দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পেল একটি সম্মানজনক সরকারি চাকরি।
পরিবার উল্লাসে মেতে উঠল।
সাজিদের বুকের ভেতর আবার লামিয়ার স্মৃতি জেগে উঠল।
সে ভাবল-
‘এবার অন্তত তাকে প্রস্তাব দেয়ার মতো অবস্থায় আছি।’
সাহস জোগাড় করে সে লামিয়ার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাল।
বাবা খুশি- সাজিদ ভদ্র, শিক্ষিত, ধর্মপ্রাণ, সম্মানজনক চাকরিজীবী।
কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত ছিল লামিয়ার হাতে।
লামিয়া একা বসে ছিল নিজের ঘরের কোণায়।
দু’দিকে যাদের উপস্থিতি- একদিকে সাজিদ, শান্ত ও প্রকৃত ভালোবাসার প্রতীক।
অন্যদিকে সেই নতুন ছেলে, যার আধুনিকতা, দম্ভ, আত্মবিশ্বাস তাকে সাময়িকভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
অস্থির, বিভ্রান্ত মন নিয়ে লামিয়া শেষমেশ সাজিদকে না বলে দেয়।
সাজিদের পৃথিবী ভেঙে গেলেও সে কিছু বলল না।
নীরবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে পেছনে ফিরে হাঁটল।
কিছু দিন পর সাজিদ বিয়ে করল।
তার স্ত্রী ছিল নম্র, সৎ, ধার্মিক ও পর্দানশীল।
সে সাজিদকে ভালোবাসত নিঃস্বার্থভাবে।
সাজিদ মনে মনে বলল,
‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ জানেন কোন হৃদয় কোন হৃদয়ের জন্য।’
অল্প সময়ের মধ্যেই তারা দাম্পত্য সুখ খুঁজে পেল।
তার জীবন স্থির, শান্ত ও আলোকিত হয়ে উঠল।
অন্যদিকে, লামিয়া বিয়ে করল সেই ছেলেকে-
যাকে লামিয়া মনে করেছিল ‘আধুনিক, স্মার্ট, স্বাধীনচেতা’।
কিন্তু বিয়ের পরই সে বুঝতে লাগল-
সে ছেলে দায়িত্বহীন, স্বার্থপর, রেগে গেলে কথায় বিষ ছোড়ে এবং তাকে কখনোই সম্মান দেয় না।
সময় যত বাড়তে লাগল, লামিয়া বুঝতে লাগল-
সাজিদ ছিল তার সত্যিকারের আশ্রয়,
তার সামনে হাঁসফাঁস না করে যে ভালোবাসা তাকে দেখিয়েছে,
যে তাকে দূর থেকে সম্মান করেছে,
যার চোখে ছিল মমতা-
সেই মানুষটিকেই সে হারিয়ে ফেলেছে নিজের সিদ্ধান্তহীনতায়।
লামিয়া একদিন আয়নায় নিজের মুখ দেখে সে নিজেকে বলল-
‘আমি মরীচিকার আলোয় দৌড়ে প্রকৃত আলোকে হারিয়েছি।’
কিন্তু তখন আর ফেরার কোনো পথ ছিল না।
সময়ের সাথে সাথে লামিয়া বুঝল-
জীবনে সব কিছু চেহারায়, স্টাইল বা বাহ্যিকতায় বিচার করা যায় না।
সত্যিকারের ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে চরিত্রে, আচরণে, সম্মানে।