ভূমিকম্পে কাঁপছে দেশ
সাড়া ফেলেছে জামায়াতের বিনামূল্যের ভবন সুরক্ষা স্ক্যান সেবা
Printed Edition
খালিদ সাইফুল্লাহ
একের পর এক ভূমিকম্পে যখন দেশের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত, তখন ব্যতিক্রমী এক আয়োজন করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে জামায়াতে ইসলামী। গত ২৬ নভেম্বর ‘ভূমিকম্প-পরবর্তী ভবন সুরক্ষা স্ক্যান’ সেবা চালু করার পর গত ১১ দিনে প্রায় চার শ’ ভবন মালিক সহযোগিতা নিয়েছে টিমের কাছ থেকে।
সম্প্রতি একের পর এক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দেশ। গত ২১ নভেম্বর দেশে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ১০ জনের বেশি মানুষ মারা যান। আহত হন ছয় শতাধিক মানুষ। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় অসংখ্য। অনেক ভবনে দেখা দিয়েছে ফাটল। এ দিন প্রথমবারের মতো দেশের মধ্যেই নরসিংদীতে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করা হয়। পরে গত ১১ দিনে আরো চার-পাঁচটি ভূমিকম্পের সাক্ষী হয়েছে দেশ। উৎপত্তিস্থলও ছিল দেশের ভেতরেই। আর ভূমিকম্প হলেই আতঙ্কিত মানুষ জীবন বাঁচাতে বাসাবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ভূমিকম্প-পরবর্তী ভবন সুরক্ষা স্ক্যান’ সেবা চাল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রকৌশল বিভাগ। দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে গত ২৬ নভেম্বর থেকে চালু হয় এ সেবা। এ বিষয়ে জামায়াত আমির নিজেই ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পর আপনার ভবন, বাসা, দোকান বা অফিসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এ উদ্বেগ নিয়ে অবহেলা করা বিপজ্জনক। আপনার স্থাপনায় যদি কিছু লক্ষণ দেখা যায়, তা হলে তাৎক্ষণিক বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন অপরিহার্য। লক্ষণগুলো হলো- ফাটল বা দৃশ্যমান ক্ষতি, ভবন হেলে যাওয়া বা বেঁকে যাওয়া, অস্বাভাবিক শব্দ বা কম্পন।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রকৌশল বিভাগ অভিজ্ঞ সিভিল ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ‘ভূমিকম্প-পরবর্তী ভবন সুরক্ষা স্ক্যান’ সেবা চালু করেছে। বর্তমানে এ সেবা ঢাকা সিটি করপোরেশন এবং আশপাশের এলাকায় দেয়া হচ্ছে। সেবার মধ্যে রয়েছে- ভবনের প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনে সাইট ভিজিট ও পরিদর্শন, দৃশ্যমান ক্ষতি এবং সম্ভাব্য বিপদের চিহ্ন নির্ণয়, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও জরুরি করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ, ভিডিও ডকুমেন্টেশন ও প্রাথমিক রিপোর্ট, প্রয়োজনে এক্সপার্ট প্যানেলের যাচাই করা ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া।
জানা যায়, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মালিকদের ফোন করে তথ্য জানাতে হটলাইন (০১৩২৭১২১৯৩৫, ০১৩২৭১২৩০৯৯, ০১৩২৭১২১৩০১) চালু করা হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ এটিই প্রথম। প্রতিদিনই হটলাইনে কল সংখ্যা বাড়ছে। রয়েছে ফেসবুক পেজও। গুগল ফর্মের মাধ্যমে নেয়া হচ্ছে প্রাথমিক তথ্য। প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ৩০ জন প্রকৌশলী ১০টি টিমে ভাগ হয়ে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। হটলাইনে দায়িত্ব পালনরত প্রকৌশলী আলিফ নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা প্রতিনিয়ত মানুষের অনুরোধ পাচ্ছি। সম্পূর্ণ বিনা খরচে এ সেবা নিতে গত ১১ দিনে প্রায় চার শ’ আবেদন পেয়েছি আমরা। কোনো ভবন মালিক সেবা চাইলে তখন প্রাথমিক তথ্য গ্রহণের পর ফিল্ড ভিজিট করে আমাদের প্রকৌশল টিম। ক্ষতির পরিমাণ কম হলে সেটি কিভাবে সংস্কার করা যায় সে বিষয়ে আমরা সাথে সাথে পরামর্শ দিই। আর যদি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয় তখন নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠাই। এরপর এক্সপার্ট টিম সেই রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতের ভবন সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রকৌশল টিমের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, আইইবি-বুয়েটের প্রকৌশলীরা আমাদের টিমে কাজ করছেন। এর মধ্যে আলোচিত টকশো ব্যক্তিত্ব প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজও রয়েছেন। আমরা বেশ সাড়া পেয়েছি। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এ সেবা দেয়া হচ্ছে। এমনকি ওই বাড়ি থেকে চা-বিস্কুটও খায় না আমাদের টিম। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টির বেশি ভবন পরিদর্শন করেছি। বেসরকারিভাবে এ ধরনের সেবা পাওয়ায় মানুষ আমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে। যাদের কম ঝুঁকি রয়েছে তারা আমাদের মাধ্যমে ভাড়াটিয়াদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ না হওয়ার ঘোষণা দেয়াচ্ছেন। তবে অনেক সময় আমরা ভাড়াটিয়াদের মাধ্যমে ভবনে ফাটলের খবর পেলে বাড়িওয়ালাকে জানালে তিনি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, অথবা নিজে ফাটল ধরা জায়গায় গোপনে হালকা প্লাস্টার করে দিচ্ছেন; যাতে তার ভবনের ভাড়াটিয়ারা আতঙ্কে অন্যত্র চলে না যায়। এতে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এ জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়। ভবনে ফাটল ধরায় অনেক ভবনের ভাড়াটিয়া বাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন বলেও আমরা জেনেছি। যত দিন প্রয়োজন হবে তত দিন এ সেবা চালু থাকবে বলেও তিনি জানান।
এ দিকে ভূমিকম্প-পরবর্তী ভবন সুরক্ষা স্ক্যান সেবা চালু করার মাধ্যমে জননিরাপত্তা নিশ্চিতের ভূমিকা পালন করায় দলের প্রকৌশল বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান। গত মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক পেজে দেয়া পোস্টে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রকৌশল বিভাগের ‘ভূমিকম্প-পরবর্তী ভবন সুরক্ষা স্ক্যান’ সেবা চালু করার মাধ্যমে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য আমি আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। এ পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণামূলক।
তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি, শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়, দেশের সব সুযোগ্য প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞের এ দুর্যোগকালীন মুহূর্তে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা অত্যাবশ্যক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের এ সুযোগ্য প্রকৌশলীরা এবং অন্যান্য পেশাজীবী ভবিষ্যতেও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় একইভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব দেবেন। ইনশা আল্লাহ, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা সবাই মিলে আরো একটি সুন্দর, নিরাপদ ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো।