সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য ক্যাম্পেইন করছে : ড. ইউনূস
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্যাম্পেইন করছে ও করবে বলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন প্রধানকে বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আইনি পরামর্শ নিয়েছে এবং টপ লিগাল এক্সপার্টরা লিখিতভাবে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার হ্যাঁ ভোট চাইতে পারবে। এ বিষয়ে কোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই। তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে সবার জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়ার ইয়াবস গতকাল রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই সাক্ষাৎ করেন বলে জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। গতকাল বিকেলে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডিমেতে এক সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল আলম জানান, ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রধানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে আওয়ামী লীগ বিষয়ে বা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি। গণভোট নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রিফর্ম এজেন্ডা বাস্তবায়ন হবে। মিশন প্রধান বলেছেন, তাদের যে মিশন এটা এখন দেশের সর্বোত্ত ছড়িয়ে পড়বে। তারা সব জায়গাকে মনিটর করবে, বড় বড় পলিটিক্যাল পার্টির সাথে কথা বলবে। অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সাথে কথা বলবে।
প্রেস সচিব জানান, আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আশ্বস্ত করেছেন যে, আগামী নির্বাচন এবং গণভোট খুব সুচারুভাবে সম্পন্ন হবে। এটা ফ্রি, ফেয়ার, ক্রেডিবল, পিসফুল এবং এটা একটা ফেস্টিভ ইলেকশন হবে। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত আছে নির্বাচন ও গণভোটের জন্য।
প্রেস সচিব জানান, প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের জন্য সমান থাকবে। এটা নিয়ে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না। তিনি বলেছেন, এটা তেমন কোনো সমস্যা হবে না। প্রফেসর ইউনূস ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর জন্য। এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ভোটিং সেন্টারগুলোতে বডি অর্ন ক্যামেরা থাকবে। সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যদের বডিতে লাগানো থাকবে ক্যামেরা, ওইটা দিয়ে মনিটর করা যাবে যে, কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না। কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোথাও অবনতি হচ্ছে কি না এবং এটা কেন্দ্রীয়ভাবে একটা অ্যাপের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। ফলে সব উপজেলা, জেলা ডিভিশন এবং একদম ঢাকা থেকেই খুব সহজে মনিটর করা যাবে কোথায় কী হচ্ছে। সব সেন্টারে সিসিটিভি থাকবে। এর ফলে খুব দ্রুত অপরাধীদের আইডেন্টিফাই করা যাবে এবং সেনাবাহিনী থাকবে র্যাপিড রেসপন্স স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে।
প্রেস সচিব আরো জানান, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, দেশের সর্বত্র এখন নির্বাচনের জোয়ার চলছে। তবে ২২ জানুয়ারির থেকে ফরমাল ক্যাম্পেইন শুরু হবে। তিনি আরো বলেছেন, ইইউর পর্যবেক্ষক পাঠানোর অর্থ হলো, বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য একটা বড় এনডোর্সমেন্ট এবং এটা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। নির্বাচনের জন্য তিনি বলেছেন, বড় চ্যালেঞ্জ হলো সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে খুব ব্যাপক মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ছড়ানো হচ্ছে এবং এটা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা উসকে দেয়া হচ্ছে। তা ছাড়া পতিত স্বৈরাচারের লোকরা ইলেকশন বানচালের চেষ্টা করবে। তবে সিকিউরিটি ফোর্সেস পুরোপুরি রেডি থাকবে যেকোনো চ্যালেঞ্জ ফেস করার জন্য।
এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, সরকার যখন হ্যাঁ-না ভোটের (গণভোট) আয়োজন করছে, তখন সরকারই হ্যাঁ ভোটের পক্ষের প্রচারণা চালাবে, এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবেন কি?
এর জবাবে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘এটা নিয়ে কেউ কেউ দ্বিমত করতে পারেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলছি, সরকার এখানে হ্যাঁ ভোটের জন্য বলবে, জনগণকে বলবে।’
তিনি বলেন, তাদের পেজগুলোতে (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ) ইতোমধ্যে বলা হচ্ছে (হ্যাঁ ভোটের পক্ষে)। সরকারের উপদেষ্টারাও বলছেন। এটা বলার মূল কারণ হচ্ছে, এই সরকার হচ্ছে সংস্কারের সরকার। এই সরকার ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে এই সংস্কারকে একটি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চেষ্টা করেছে। এটাই এখন গণভোটে দেয়া হচ্ছে।
প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা জনগণকে বলছি, আপনারা যদি আর অপশাসন না চান, আপনারা যদি স্বৈরাচারকে আর ফেরত না চান, তাহলে অবশ্যই আপনারা হ্যাঁ ভোট দেবেন। এখন জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু আমাদের যা দায়িত্ব সেটা আমরা করছি। এই সরকার করছে।’
এদিকে বিভিন্ন দলের অভিযোগ যে, বিএনপিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের দাবি, ‘সরকার কোনো দলকেই বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে না।’
দায়িত্ব ছাড়ার পর কী করবেন প্রধান উপদেষ্টা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর এক মাস বাকি। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার এলেই দায়িত্ব শেষ হবে বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। তারপর তিনি কী করবেন, সে বিষয়ে জানালেন তার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে জাপান সফরে যাবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশটির বিখ্যাত ‘সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন’-এর আমন্ত্রণে এই সফরে যাবেন নোবেল জয়ী অধ্যাপক।
এর আগে গতকাল সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের স্ত্রী আকি আবে।
ওই সাক্ষাতের বিষয়ে উপ-প্রেস সচিব জানান, বৈঠকে আকি আবে প্রধান উপদেষ্টার কাছে নির্বাচন পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে প্রধান উপদেষ্টা তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার কথা জানান।
আজাদ মজুমদার জানান, ‘ড. ইউনূস ডিজিটাল হেলথ কেয়ারে কাজ করবেন, যাতে করে আমাদের দেশের নারী বা ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর সহায়তা বাড়ে। পাশাপাশি প্রবাসীরাও যাতে ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের পরিবারের খোঁজখবর রাখতে পারেন। এ ছাড়া তিনি তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির কাজ এবং তিন শূন্য নিয়ে কাজ করবেন।’
উপ-প্রেস সচিব জানান, ‘প্রধান উপদেষ্টা মূলত সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে জাপান যাবেন। এই ফাউন্ডেশনটি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করে থাকে। বিশেষ করে সমুদ্র বিষয়ক গবেষণায় তাদের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।’
জাপান সফরে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা সমুদ্র সম্পদ ও ব্লু-ইকোনমি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করবেন বলেও জানান উপ-প্রেস সচিব।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. ইউনূস। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের হাতে দায়িত্ব দিয়ে তিনি তার শাসনামল শেষ করবেন।