সংরক্ষিত বনভূমি নাকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, ভাওয়াল নিয়ে দু’পক্ষ মুখোমুখি
Printed Edition
আজিজুল হক (গাজীপুর মহানগর) ও আব্দুল আজিজ (জয়দেবপুর)
গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপনা নির্মাণ কেন্দ্র করে দু’টি পক্ষ এখন মুখোমুখি। এক পক্ষে রয়েছে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং অপর পক্ষে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। পক্ষদ্বয়ের মধ্যে অবস্থানগত অবস্থান নিয়ে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। উভয়পক্ষই বিষয়টিকে সরকারি উন্নয়ন ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করলেও, প্রকল্পের অবস্থান ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের কোর জোনের সীমানা ও জমির শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে দুই পক্ষই ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে এবং সংলগ্ন এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ ও ময়লা ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম চলায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ওপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ঢাকার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসাইন জানান, জাতীয় উদ্যানের কোর জোনে এবং তার সীমানা এলাকায় কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বা মাটি ভরাটের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় তারা বাধা দেন। পরে কিছু কাঠামো অপসারণের ঘটনাও ঘটে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন থেকে বিপুলসংখ্যক লোকজন নিয়ে সীমানা প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত করে রাস্তা নির্মাণ ও অভ্যন্তরে কাজ চালানোর চেষ্টা করা হয়, যা বন আইন লঙ্ঘন। বন বিভাগের দাবি, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং আইনগত পদক্ষেপের প্রক্রিয়া চলমান। অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সোহেল হাসান জানান, প্রকল্পটি মূলত নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের অংশ।
তার দাবি, মহাসড়কের পাশে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ এবং একটি আধুনিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উপযুক্ত জমি সঙ্কটের কারণে একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হয়। তবে বন বিভাগের কিছু কার্যক্রমের কারণে স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, তারা পরিবেশগত ক্ষতি কমিয়ে একটি টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গাজীপুর শহরের দ্রুত নগরায়ণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পরিবেশ সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও দর্শনার্থীদের নিয়মিত যাতায়াত থাকায় যেকোনো অবকাঠামোগত পরিবর্তন পরিবেশ ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
বন বিভাগ বলছে, আইন অনুযায়ী বিকল্প জায়গা নির্ধারণ করা গেলে সমস্যা সমাধান সম্ভব। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন বলছে, তারা বিকল্প জমি ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী। পরিবেশবিদ ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের আন্তঃদফতরীয় প্রকল্পে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ সমীক্ষা এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।