দেশে বহু অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারিয়েছে

নবজাতকরা জন্মই নিচ্ছে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে

Printed Edition

হামিম উল কবির

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশে বহুল ব্যবহৃত অনেক অ্যান্টিবায়োটিক আগের মতো কার্যকর নেই, রোগীর দেহে প্রয়োগ করলে কোনো উন্নতি হয় না। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে নবজাতকদের শরীরেও একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, বাংলাদেশে ওষুধ পাওয়া খুবই সহজ, ফার্মেসিতে গেলেই টাকা দিলে ওষুধ পাওয়া যায়। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকসহ আরো বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবনের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। ফলে অনেক জীবাণু ক্রমেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধের প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাংলাদেশে এমন পর্যায়ে গেছে যে, সদ্যাজাত শিশুটিও কয়েকটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়েই জন্ম নিচ্ছে উদাহরণও রয়েছে। অনেক শিশুর জন্মের পর পরই তাদের রক্তের কালচার করে দেখা গেছে, সেফট্রায়াক্সন, সেফটাজিডাইম ও সেফিক্সিম এই তিনটি বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে আছে, অর্থাৎ এই তিনটি অ্যান্টিবায়োটিক শিশুটির শরীরে কাজ করবে ন। বিষয়টি শিশুটির পরিবারকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। মা শারমিন বিনতে হক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, শিশুটির যদি কোনো অ্যান্টিবায়োটিক লাগে তাহলে আমরা বিপদে পড়তে পারি।

চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালের পরিবেশেই বহু অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বিদ্যমান। বিশেষ করে হাসপাতালের বেড, আইসিইউ ও অস্ত্রোপচার কগুলোতে এসব জীবাণুর উদ্বেগজনক উপস্থিতি রয়েছে। নিয়মিত হাসপাতালের বেড, আইসিইউ, এনআইসিইউ জীবাণুমুক্ত করতে পারলে কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু হাসপাতালে এই কাজটি খুবই কম করা হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, এসব অপারেশন থিয়েটার বা আইসিইউ বা বেডগুলো খালি করে এগুলো জীবাণুমুক্ত করার সুযোগ খুবই কম পাওয়া যায়। ফলে হাসপাতালে সংক্রমণের ঝুঁকিও কমছে না।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল নিয়ে কাজ করেন অধ্যাপক ডা: মো: সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহারে জীবাণু সংক্রমণের বিরুদ্ধে সুস্থ হয়ে ওঠা কঠিন করে তুলছে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ফলে রোগীর হাসপাতালে অবস্থানের সময় ও চিকিৎসার খরচ বাড়ে। এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে নতুন কোনো যুগান্তকারী অ্যান্টিবায়োটিকের বাজারে আসার সম্ভাবনা কম। তাই বর্তমানে যে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আমাদের কাছে আছে সেগুলোকে সংরক্ষণ করতে হলে নির্বিচারে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। দেশব্যাপী সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।’ বিশিষ্ট সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট অধ্যাপক ডা: মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। এ জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিজেদের স্বার্থেই। যেমন অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন অনুসারে বিক্রি হয়েছে কি না তা যাচাই করে দেখতে পারে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর।’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৭৫ শতাংশ সংক্রমণের জন্য দায়ী ই-কোলাই, স্ট্যাফাইলোকক্কাস, কেবসিয়েলা ও সিউডোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অনেক অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে গেছে। এমনকি আগে শুধু আইসিইউর রোগীদের যে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হতো দ্রুত অপারেশনের স্থানটি শুকানোর জন্য সেই শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক এখন সাধারণ ওয়ার্ডের রোগীদেরও দিতে হচ্ছে। অন্য দিকে গ্রামের অর্ধশিক্ষিত হাতুড়ে (কোয়াক) ডাক্তাররাও তৃতীয় প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক যত্রতত্র ব্যবহার করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোর্স শেষ না করার অভিযোগ রয়েছে।

রোগতত্ত্ব রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ এই ১০ বছরে পৃথিবীতে ৪২টি অ্যান্টিবায়োটিক আসলেও ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক এসেছে মাত্র ২১টি। ২০০০ সালের পর নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পরিমাণ একেবারেই কমে গেছে। ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক এসেছে মাত্র ছয়টি এবং অপর দিকে ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মাত্র ৯টি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক এসেছে। আইইডিসিআর ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ১৪ হাজার ৬৬৯ জনের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে ১০টি পরিচিত জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিককে প্রতিরোধী পেয়েছে (রেজিস্ট্যান্ট)। গবেষণার ফলাফলে অ্যান্টিবায়োটিককে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধী পাওয়া গেছে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে। এই বিভাগে অ্যান্টিবায়োটিক ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধী ছিল। অপর দিকে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগ ও আইসিইউ রুমে ১১ শতাংশ প্রতিরোধী ছিল। অন্যান্য বিভাগে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে গেছে ১২ শতাংশ। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের হার ক্রমাগত কমছে। অন্য দিকে জীবাণুর প্রতিরোধ মতা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার বন্ধ না হলে এমন সময় আসতে পারে, যখন সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসার জন্যও কার্যকর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্ট থাকবে না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করা এবং এর যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সবার মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।