এস আলম টাকা বের করে নেয়ায় লোকসানের মুখে ৫ ইসলামী ব্যাংক
গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাচ্ছে দুষ্টচক্র : গভর্নর
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, এস আলম ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে টাকা বের করে নিয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো লোকসানের মুখে পড়েছে। লোকসানের কারণে শরিয়াহ নীতিমালা অনুযায়ী এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের মুনাফা দেয়ার সুযোগ ছিল না। তবুও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য সরকারিভাবে ৪ শতাংশ মুনাফা সহায়তা দেয়া হচ্ছে, যাকে গভর্নর ‘ইহসান’ বা সহমর্মিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; বরং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার অংশ। এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক যেন সফল না হয় সেজন্য ওই দুষ্ট চক্রটি নানাভাবে অপচেষ্টা চালাচ্ছে। গভর্নর দৃঢ় ভাষায় বলেন, ‘যে যত অপপ্রচার চালাক, আমানতকারীদের মূল টাকা শতভাগ নিরাপদ।’ যারাই গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করুক না কেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং কোনো ধরনের অন্যায় বা অস্পষ্টতা বরদাশত করা হবে না।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর এ কথা বলেন। তিনি বলেন, পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আমানতকারীদের উদ্বেগ, গুজব ও বিভ্রান্তি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবের পাশাপাশি এখন থেকে মেয়াদি আমানতকারীরাও সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন। একই সাথে আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে নিয়মিতভাবে মাসিক ভিত্তিতে মেয়াদি আমানতের মুনাফা উত্তোলনের সুযোগ চালু হবে।
গভর্নর জানান, একীভূত এই ব্যাংক গঠনের পেছনে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের দীর্ঘ দিনের অনিয়ম, লোকসান ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এই বিশাল আমানত সুরক্ষার স্বার্থেই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমন্বিতভাবে ধাপে ধাপে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৩ সাল পর্যন্ত আগের মুনাফা পরিশোধ করা হবে এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাজারভিত্তিক মুনাফা কাঠামো কার্যকর হয়েছে। এক বছরের বেশি মেয়াদি আমানতে ৯.৫ শতাংশ এবং ছয় মাস থেকে এক বছর মেয়াদি আমানতে ৯ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ করা হয়েছে। জানুয়ারি মাসের মুনাফা ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই উত্তোলনযোগ্য হবে, যা বহু গ্রাহকের মাসিক ব্যয় নির্বাহে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উত্তোলনসীমা প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, একবারে বড় অঙ্কের টাকা তোলার চাপ সৃষ্টি হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ‘সুইচ গেট’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সে কারণেই ধাপে ধাপে উত্তোলন স্কিম চালু করা হয়েছে। বর্তমানে যেকোনো স্কিম থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে আমানতকারীরা তাদের আমানতের বিপরীতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন, যা তাৎক্ষণিক নগদ চাহিদা পূরণে বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করবে।
গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নে শিগগিরই একটি হটলাইন সেবা চালু করা হবে, যেখানে ফোন, ই-মেইল বা অন্যান্য মাধ্যমে সরাসরি অভিযোগ জানানো যাবে। গভর্নরের ভাষায়, উদ্দেশ্য একটাই- গ্রাহক যেন তার ন্যায্য পাওনা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পায় এবং কোনো প্রশাসনিক বিভ্রান্তিতে না পড়ে। এ ছাড়া অনলাইন ব্যাংকিং কাঠামো দ্রুত স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আরটিজিএস, বিফটিএন, এটিএমসহ সব ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা ধাপে ধাপে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরবে। পাঁচ ব্যাংকের সিস্টেম একীভূত করা সময়সাপেক্ষ হলেও দ্রুতগতিতে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কোনো সঙ্কটগ্রস্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো নয়; বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রিত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। এখানে সীমাবদ্ধতা আছে, ধীরগতি আছে; কিন্তু দিকনির্দেশনা স্পষ্ট- আমানতকারীদের সুরক্ষা, আস্থা পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা। এই প্রক্রিয়ায় হয়তো শতভাগ স্বস্তি এখনই আসবে না, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষণায় একটি বিষয় পরিষ্কার- রাষ্ট্র নিজেই এই একীভূত ব্যাংকের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, এবং আমানতকারীদের স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পুরো সংস্কার কাঠামো এগোচ্ছে।