বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে নতুন ইঙ্গিত
স্বস্তিতে চলতি হিসাব, রেমিট্যান্সে বড় লাফ
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের সার্বিক চিত্রে কিছুটা ইতিবাচক বাতাস বইতে শুরু করেছে। সদ্য প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে ’২৬ মাস পর্যন্ত (জুলাই-মে) প্রাপ্ত অনিরূপিত অর্থনৈতিক ডাটা পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, টানা চাপ সামলে চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল রেমিট্যান্সের ওপর ভর করেই মূলত অর্থনীতির এই ইতিবাচক মোড় দেখা দিয়েছে। তবে বাণিজ্যে চড়া আমদানি ব্যয়, তৈরী পোশাক খাতের মন্থর রফতানি আয় এবং সার্বিক ভারসাম্য রক্ষায় এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের সাম্প্রতিক তথ্য একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরে। এক দিকে প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অন্য দিকে আমদানি বৃদ্ধি এবং রফতানি আয় সামান্য কমে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি আরো বিস্তৃত হয়েছে।
চলতি হিসাবের ঘাটতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ৭৭৮ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ৩০১ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৬১.৩ শতাংশ উন্নতির ইঙ্গিত দেয়। এই উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। প্রবাসী আয় ২৭.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ১৯.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
অন্য দিকে রফতানি আয় ২ শতাংশ কমে ৪০.০৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এলেও আমদানি ব্যয় ৬.৩ শতাংশ বেড়ে ৬৪.০২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ১৯.৩৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৩.৯৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ২৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী মোট রিজার্ভ ২০.৫২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৯.৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ৪৫.৩ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এটি বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা কিছুটা শক্তিশালী হলেও, রফতানির স্থবিরতা এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি আগামী সময়ে নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
রেমিট্যান্সের সুবাতাস ও চলতি হিসাবের ঘুরে দাঁড়ানো
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈদেশিক লেনদেনের সবচেয়ে বড় স্বস্তি এসেছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ থেকে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত যেখানে প্রবাসী আয় ছিল ২৭ হাজার ৫০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা ১৯.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৭৭০ মিলিয়ন ডলারে। রেমিট্যান্সের এই বিশাল লাফের কারণে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট বা চলতি হিসাবের ঘাটতি ৭৭৮ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৩০১ মিলিয়ন ডলারে চলে এসেছে। এটি নিশ্চিতভাবেই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
বাণিজ্য ঘাটতি ও রফতানিতে মন্দার চাপ
রেমিট্যান্স আশার আলো দেখালেও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিপরীত সুর শোনা যাচ্ছে। প্রথমত, রফতানি আয়ে শ্লথগতি। মোট রফতানি আয় ২.০ শতাংশ কমে ৪০ হাজার ৩৯ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। রফতানি খাতের প্রধান মেরুদণ্ড তৈরী পোশাক খাতে আয় ২.৬ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৩৫ হাজার ৫৯৬ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি। দেশে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে আমদানি ব্যয় ৬.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৪ হাজার ২৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রফতানি হ্রাস ও আমদানি বৃদ্ধির যৌথ প্রভাবে বাণিজ্য ঘাটতি ১৯ হাজার ৩৭৭ মিলিয়ন ডলার থেকে ২৩ হাজার ৯৮৪ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে (ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২৩.৮ শতাংশ)।
মূলধন ও আর্থিক হিসাবের স্থায়িত্ব
অর্থনীতির স্থায়ী বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহের চিত্র কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। আর্থিক হিসাব আগের বছরের প্রথমার্ধের নেতিবাচক ধারার তুলনায় এবার এটি বেশ মজবুত অবস্থানে রয়েছে, যা চার হাজার ১৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আর বিনিয়োগ ও ঋণ খাতে নতুন সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ কিছুটা কমে এক হাজার ৩১২ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে (আগে ছিল ১,৫৫০ মিলিয়ন)। এ ছাড়া মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ২০.৮ শতাংশ কমে চার হাজার ১৪৩ মিলিয়ন ডলারে এসেছে। বিপরীতে পূর্বের ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরিমাণ ১৫.৮ শতাংশ বেড়ে দুই হাজার ৮৩৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় স্বস্তি
গত বছরের তুলনায় দেশের গ্রস অফিসিয়াল রিজার্ভের অবস্থা চোখে পড়ার মতো উন্নতি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ মানদণ্ড অনুযায়ী রিজার্ভ ২০ হাজার ৫২১ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৯ হাজার ৮১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের সংরক্ষিত এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় পাঁচ মাস থেকে ৫.৬ মাসের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা আমদানি করা সম্ভব, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে বেশ নিরাপদ সীমা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে: প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ধারাবাহিক আগ্রহ দেশকে সাময়িক সঙ্কট থেকে রক্ষা করলেও বাণিজ্য ঘাটতিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
বিশ্ববাজারে তৈরী পোশাকের চাহিদা পুনরুদ্ধারে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া, রফতানি পণ্যে বহুমুখীকরণ এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বাধাগুলো দ্রুত নিরসন করা দরকার। অন্যথায় আমদানি ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলে রেমিট্যান্সের বাড়তি সুবিধাটুকুও বাণিজ্য ঘাটতির পেছনে উধাও হয়ে যেতে পারে।