নেতানিয়াহুর দফতরে ইরানের হামলা

Printed Edition
first-1
ইরানের ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্র

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • কুয়েতের ভুল নিশানায় ৩টি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত
  • সৌদির তেল শোধনাগার ও সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে হামলা
  • তেলের দাম বাড়ল ১৩ শতাংশ
  • ৫০% বাড়ল এলএনজির দাম

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার জেরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সঙ্ঘাতের আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় এবার জায়নবাদী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দফতর ও দেশটির বিমানবাহিনীর কমান্ডারের কার্যালয় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল সোমবার আইআরজিসির গণসংযোগ বিভাগ জানায়, ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্রের দশম দফা লক্ষ্যভেদী ও আকস্মিক হামলার মাধ্যমে ‘জায়নবাদী শাসনের অপরাধী প্রধানমন্ত্রী’র দফতরসহ বিমানবাহিনী কমান্ডারের অবস্থান লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। এতে জায়নবাদী শাসনের প্রধানমন্ত্রীর ‘ভাগ্য অনিশ্চয়তার ঘন মেঘে আচ্ছন্ন’ হয়ে গেছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়। শনিবার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালানোর পর তেহরান পাল্টা প্রতিশোধমূলক০ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে ইসরাইলের অধিকৃত ভূখণ্ডে। ইরান এ পর্যন্ত ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর ওপর মোট ১০ দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এ দিকে ‘ভুল করে’ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অত্যাধুুনিক যুদ্ধবিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করেছে মিত্র দেশ কুয়েত। অন্য দিকে তেহরানে পাল্টা পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার আরামকোর স্থাপনার ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালানো হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের ১৩১ শহর, নিহত সাড়ে পাঁচ শ’ : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ইসরাইলি ও মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের অন্তত ১৩১টি শহরে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানে অন্তত ৫৫৫ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

ইরানের রেড ক্রিসেন্টের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছেÑ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় দেশজুড়ে ১৩১টি শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব শহরে ত্রাণকার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে রেড ক্রিসেন্ট। সংগঠনটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে। সারা দেশে এক লাখের বেশি সদস্য সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ৪০ লাখ স্বেচ্ছাসেবকের একটি নেটওয়ার্ক প্রস্তুত রয়েছে।

অন্য দিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস-আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা তেল আবিবে একটি সরকারি কমপ্লেক্সে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হাইফায় নিরাপত্তা ও সামরিক কেন্দ্রগুলোতে এবং পূর্ব জেরুসালেমে হামলা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দশম দফার এই হামলার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল তেল আবিবে জায়নিস্ট শাসনের সরকারি কমপ্লেক্সে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা, হাইফায় সামরিক ও নিরাপত্তা কেন্দ্রগুলোতে আঘাত এবং পূর্ব জেরুসালেমে হামলা।’ পূর্ব জেরুজালেম মূলত আরব অধ্যুষিত এলাকা। ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে ফিলিস্তিনিরা এ অঞ্চল দাবি করে আসছে।

কুয়েতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত : ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট বলেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার মধ্যেই কুয়েতে তিনটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেছে। কুয়েতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ‘ভুলবশত’ ভূপাতিত করেছে দেশটির নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সোমবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই দাবি করা হয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি হামলার মুখে কুয়েতের একটি কমব্যাট মিশনে থাকাবস্থায় তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান এ দুর্ঘটনার শিকার হয়। সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কুয়েতের ওপর ইরানের বিমানবাহিনী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে হামলা চালানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। উল্লেখ্য, চলমান এই যুদ্ধে এই প্রথম ইরানের পুরনো বিমান বহরকে সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নিতে দেখা গেল। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, কুয়েতি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো ভুলবশত ভূপাতিত হয়েছে। বিধ্বস্ত হওয়া বিমানগুলোর ছয়জন ক্রু সদস্যই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। কুয়েত এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার কথা স্বীকার করেছে।

লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত ৩১ : লেবাননজুড়ে ইসরাইলি বাহিনীর জোরালো বিমান হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ১৪৯ জন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার লেবাননের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় এই ভয়াবহ হামলা চালানো হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে কারণ অনেক এলাকায় উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান।

এদিকে লেবাননের ১৮টি শহর ও গ্রাম উচ্ছেদের হুমকি দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তারা বলছে, ওই এলাকাগুলো হিজবুল্লাহ ব্যবহার করছে।

দুবাই, আবুধাবি, দোহা, মানামা ও জেরুসালেমে বিস্ফোরণ : দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি, কাতারের দোহা এবং বাহরাইনের মানামাতে নতুন করে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সোমবার এসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এ ছাড়া জেরুসালেম শহরেও বিস্ফোরণ হয়েছে। বিভিন্ন বার্তা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার ও বাহরাইনের রাজধানীতে বিকট শব্দে কয়েকটি বিস্ফোরণ হয়েছে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে জনবহুল শহর দুবাইয়েও বিস্ফোরণ হয়েছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থে হামলা করছে ইরানি বাহিনী।

নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ৪ : ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত চারজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। এর আগে সেন্টকম জানিয়েছিল যে ইরানের হামলায় তিনজন সেনা নিহত এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ইরানের প্রাথমিক হামলার সময় গুরুতর আহত হওয়া চতুর্থ সেনা সদস্য চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

সৌদির তেল শোধনাগারে হামলা : সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর অধীন রাস তানুরা নামের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে কারখানাটিতে আগুন ধরে গিয়েছিল। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ বেশ দ্রুততার সাথে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। হামলার পর রাস তানুরা নামের সেই শোধনাগারটি বন্ধ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ হামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিও চিত্র দেখা গেছে। কয়েকটি চিত্রে দূর থেকে দেখা গেছে, রাস তানুরা থেকে বড় ধোঁয়ার কণ্ডলি উঠছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এখনো এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি।

সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা : ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশ সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে অবস্থিত ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালের দিকে ঘাঁটিটির রানওয়েতে একটি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন আছড়ে পড়েছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে পারছি না। তবে এটুকু বলতে পারি যে ঘাঁটি ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করা হচ্ছে।” এই ড্রোন হামলায় হতাহতের কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। কোথা থেকে এই হামলা এসেছে বা কারা এই হামলার জন্য দায়ী সে ব্যাপারে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাজ্য।

খামেনির আহত স্ত্রী মারা গেছেন : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আহত স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেহ মারা গেছেন। ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আহত হয়েছিলেন মানসুরেহ। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গতকাল মানসুরেহ খোজাস্তেহর মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।

ট্রাম্পের আলোচনার প্রস্তাব নাকচ ইরানের : এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিঞ্জানি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের আলোচনার গুঞ্জন সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোতে দাবি করা হয়েছিল যে, ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে, তবে লারিঞ্জানি এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দু’টি বিষয় উল্লেখ করেছেন; প্রথমত, ইরান এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো সংলাপে বসবে না এবং দ্বিতীয়ত, ইরান এখন কেবল আত্মরক্ষায় নিয়োজিত আছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই যুদ্ধের সূচনা করেনি, বরং তারা আক্রান্ত হওয়ার পর কেবল পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে লারিজানি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভুল ও কাল্পনিক নীতি এই অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিয়েছে। লারিজানি অভিযোগ করেন, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান এখন ‘ইসরাইল ফার্স্ট’-এ পরিণত হয়েছে এবং ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন সেনাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে।

তেলের দাম বাড়ল ১৩ শতাংশ : পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই এখন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে। নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, রোববার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধসের শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে হামলার কারণে তেল ও গ্যাস উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চল থেকে সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এ বিঘœ যদি সাময়িকও হয়, তবুও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া প্রায় নিশ্চিত।

তবে দাম ঠিক কতটা বাড়বে এবং তা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এ বছর এরই মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। সবশেষ গত শুক্রবার তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭৩ ডলারের কাছাকাছি ছিল। রোববার তা সাময়িকভাবে ৮২ ডলার অতিক্রম করে আবার কিছুটা কমেছে।

এ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে সোমবার এশিয়ার বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। অন্য দিকে ধস নেমেছে শেয়ারবাজারে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক জাহাজে হামলার খবরও পাওয়া গেছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পাঠানো হয়। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। তবে দেশটির রেভোলিউশনারি বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এ পথ দিয়ে চলাচল না করার ব্যাপারে সতর্কবার্তা দিয়েছে।

৫০% বাড়ল এলএনজির দাম : মধ্যপ্রাচ্যে হামলার কারণে প্রধান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানিকারক কাতার উৎপাদন স্থগিত করেছে বলে জানানোর পর ডাচ ও ব্রিটিশ পাইকারি গ্যাসের মানদণ্ডমূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উড ম্যাকেনজির গ্যাস ও এলএনজি গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাসিমো দি ওদোয়ার্দো বলেন, ‘এলএনজি সরবরাহে বিঘœ ঘটলে প্রাপ্য কার্গোর জন্য এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে প্রতিযোগিতা আবারো জোরদার হবে।’

আইসিইর তথ্যানুযায়ী, ইউরোপের মানদণ্ডমূল্য হিসেবে বিবেচিত টিটিএফ হাবে ডাচ ফ্রন্ট-মাস চুক্তির দাম জিএমটি ১২৫৫ পর্যন্ত প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টা (এমডব্লিউএইচ) ১৪.৫৬ ইউরো বেড়ে ৪৬.৫২ ইউরোতে পৌঁছায়, যা প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ একক (এমএমবিটিইউ) প্রায় ১৫.৯২ ডলারের সমান। দিনের শুরুর দিকে দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি ছিল, তবে কাতার এনার্জির উৎপাদন স্থগিতের পর বৃদ্ধি আরো সম্প্রসারিত হয়।

প্ল্যাটসের তথ্য অনুযায়ী, এশীয় এলএনজির মানদণ্ডমূল্য হিসেবে বহুল ব্যবহৃত এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সোমবার সকালে প্রায় ৩৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫.০৬৮ ডলারে দাঁড়ায়। আইএনজির পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধান ওয়ারেন প্যাটারসন বলেন, ‘যদি এলএনজি বা গ্যাস বাজার কাতারি এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্ভাবনা মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে, তবে টিটিএফ সম্ভাব্যভাবে ৮০-১০০ ইউরো বা এমডব্লিউএইচ (২৮-৩৫ ডলার বা এমএমবিটিইউ) পর্যন্ত লাফিয়ে উঠতে পারে।’ আইসিইর তথ্যানুযায়ী, ব্রিটিশ এপ্রিল চুক্তির দাম ৪০.৮৩ পেন্স বেড়ে ১১৯.৪০ পেন্স প্রতি থার্মে পৌঁছায়।

ইরানই সিদ্ধান্ত নেবে যুদ্ধ কখন শেষ হবে-আরাকচি : যুদ্ধ কখন এবং কিভাবে শেষ হবে সেই সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পূর্ব ও পশ্চিমে দুই দশকের পরাজয় থেকে ইরান শিক্ষা নিয়েছে। এই কথার মাধ্যমে তিনি মূলত ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের দিকে ইঙ্গিত করেন। আরাকচি বলেন, ‘আমাদের রাজধানীতে বোমা হামলা আমাদের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।’

ইরানে হামলা ‘অনন্ত যুদ্ধে’ রূপ নেবে না-মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী : মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং বিধ্বংসী পদ্ধতিতে হামলা চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। সোমবার পেন্টাগনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর থ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ওই মন্তব্য করেছেন তিনি। এ সময় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযান কোনোভাবেই ‘অনন্ত যুদ্ধে’ রূপ নেবে না। সংবাদ সম্মেলনে ইরানের হামলায় মার্কিন চার সেনা সদস্যের মৃত্যুর তথ্য স্বীকার করে হেগসেথ বলেন, এই ধরনের অভিযানে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে।