ইরানে মার্কিন হামলায় যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা আইন বিশেষজ্ঞদের
Printed Edition
এনবিসি নিউজ
ইরানে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানের ধরন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ। হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডের মতো খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব বিশেষজ্ঞ গত বৃহস্পতিবার একটি খোলা চিঠিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
‘জাস্ট সিকিউরিটি’ জার্নালে প্রকাশিত ওই চিঠিতে বিশেষজ্ঞরা জানান, ইরানের বিদ্যুৎ ও পানি শোধন কেন্দ্রে হামলার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের পরিপন্থী। চিঠিতে গত মার্চ মাসে ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি ইরানে হামলা চালানোকে ‘মজা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এ ছাড়া পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথের ‘যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানা হবে না’- এমন বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, মার্কিন হামলায় ইতোমধ্যে ইরানের স্কুল, হাসপাতাল ও বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলার দায় মার্কিন বাহিনীর ওপর আসার পর সামরিক তদন্ত শুরু হয়। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সেই হামলায় ১৭৫ জন নিহত হয়েছিল।
গত বুধবার এক টেলিভিশন ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে ‘পাথর যুগে’ ফিরিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আগামী দুই-তিন সপ্তাহ আমরা তাদের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানব।’ ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে ‘অমানবিক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় মুসলিম অধিকার সংস্থা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান আক্রমণের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। জবাবে ইরানও ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। এই রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইউরোপকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে : বোটেঙ্গা
ডেইলি সাবাহ জানায়, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বামপন্থী দলের সদস্য মার্ক বোটেঙ্গা বলেছেন, ‘ইউরোপ যদি একটি নির্ভরযোগ্য শক্তি হতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের এই লেজুড়বৃত্তি থেকে সরে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম অনুগত থাকা এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি ছোট অংশীদার হয়ে থাকার প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ওয়াশিংটনের প্রতি ইইউর এই অনুগত অবস্থান জ্বালানির মূল্য থেকে শুরু করে গ্লোবাল সাউথে জোটটির অবস্থান পর্যন্ত ইউরোপীয় স্বার্থকে ক্ষুণœ করছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বামপন্থী দলের এই সদস্য জানান, গাজায় জাতিগত নিধন ও গণহত্যার জন্য ইইউ ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার অন্যতম কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য। তিনি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনকে ইউরোপের নিরাপত্তার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘আনুগত্য’কে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। সম্প্রতি ফন ডার লিয়েন বলেছিলেন, ‘ইউরোপ আর পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার রক্ষক হতে পারে না।’ এই মন্তব্যের জেরে বোটেঙ্গা বলেন, ‘আমি মনে করি উরসুলা ফন ডার লিয়েনের এই ধরনের বক্তব্য বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। কারণ এগুলো জাতিসঙ্ঘভিত্তিক ব্যবস্থাকে ক্ষুণœ করে। তারা মূলত এই বার্তাই দিচ্ছে যে ইউরোপ আর আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না।’
আন্তর্জাতিক আইন পরিত্যাগ করলে বিশ্বজুড়ে লাগামহীন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এমন একটি বিশ্ব তৈরি হবে যেখানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানে যেভাবে বিজ্ঞানীদের হত্যা করছে, তা স্বাভাবিক বলে গণ্য হবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় যেভাবে প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করেছে, তা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিউবায় তেল প্রবেশ করতে না দিয়ে পুরো দেশকে শ্বাসরুদ্ধ করার মতো ঘটনা স্বাভাবিক হবে এবং ফিলিস্তিনের মতো জায়গায় গণহত্যা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’
ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নেসেটের অনুমোদনের বিষয়ে তিনি জানান, ইইউ এই ইস্যুতেও নীরব থেকেছে। তিনি বলেন, ‘ইইউ বলছে, এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। কিন্তু ইসরাইলের সাথে আমাদের একটি অংশীদারত্ব চুক্তি রয়েছে, যেখানে বলা আছে ইসরাইলকে মানবাধিকার সম্মান করতে হবে। আমরা কেন সেই চুক্তি স্থগিত করছি?’ ফিলিস্তিনি বন্দিবিষয়ক কমিশনের তথ্যমতে, ইসরাইলি কারাগারে বন্দী ১১৭ জন ফিলিস্তিনির ওপর এই আইন প্রয়োগ হতে পারে। জোটটি মৃত্যুদণ্ড আইনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ইসরাইলকে তার আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বোটেঙ্গা এই পদক্ষেপকে নিছক কথার কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি আপনার কথার ওপর ভিত্তি করে কাজ না করেন, তবে অন্য দেশগুলোর কাছে আপনার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না এবং তারা আপনাকে একটি স্বাধীন শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করবে না।’
ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তার সমালোচনা করে বোটেঙ্গা জানান, তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলোতে মূলত ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের কর্মকাণ্ড এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা কেবল তেহরানকে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে হামলা বন্ধ করতে বলেছে। বোটেঙ্গা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশ্বাসযোগ্য হতে চাইলে সবার আগে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আর এখানকার বাস্তবতা হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘ দিনের অংশীদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাপক লঙ্ঘন করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তারা মূলত ভুলে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরানে হামলা চালিয়েছে। তাই তারা ধারাবাহিকভাবে ইরানকে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।’
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ এ পর্যন্ত এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরান ইসরাইল, জর্দান, ইরাক এবং মার্কিন সামরিক স্থাপনা থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে হতাহত ও অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজার ও বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
বোটেঙ্গা অন্যান্য সঙ্ঘাত, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইইউর দ্বৈত নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় জোটটি ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অথচ ইসরাইলের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিক্রিয়া বেশ সংযত। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইইউর এই নিষ্ক্রিয়তা কেবল তাদের ভাবমূর্তিই ক্ষুণœ করছে না, বরং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেও দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
লেবানন ‘দ্বিতীয় গাজা’ হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে বোটেঙ্গা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বিবৃতিগুলোকে একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি ইসরাইলিদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে তারা কী করছে তা দেখেন, তবে বুঝতে পারবেন তারা পুরো গ্রাম ধ্বংস করছে এবং জায়গা খালি করে দিচ্ছে। এটি জাতিগত নিধন।’ তিনি আরো বলেন, ‘এগুলো যুদ্ধাপরাধ। এর পাশাপাশি দখলদারিত্ব, সংযুক্তি এবং সম্প্রসারণের একটি কৌশল রয়েছে, যা অন্য কোনো দেশ করলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিন্দা জানাত এবং ব্যবস্থা নিত।’
২০২৪ সালের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও, ২ মার্চ হিজবুল্লাহর একটি আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালিয়েছে। লেবাননের কর্তৃপক্ষের মতে, তারপর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত এক হাজার ২৭০ জন নিহত এবং তিন হাজার ৭৫০ জন আহত হয়েছেন।
বোটেঙ্গা ইইউকে কেবল সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্যই অভিযুক্ত করেননি, বরং বিদ্যমান চুক্তিগুলোর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এই সহিংসতায় সহায়তা করার জন্যও দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে এটি থামাতে কিছুই করেনি, বিষয়টি শুধু এমন নয়। ইসরাইলের সাথে আমাদের একটি বিশেষ অংশীদারত্ব রয়েছে। এটি অত্যন্ত খারাপ একটি বিষয়। এর মানে হলো, ইউরোপের জনগণের করের টাকা ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাচ্ছে। এটি ইইউকে সরাসরি অপরাধের অংশীদার করছে।’