ময়মনসিংহে ছিনতাই আতঙ্ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন নগরবাসীর

হটস্পট ১৫ এলাকা

Printed Edition

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহে ছিনতাই এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি নগরবাসীর নিত্য আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই ব্রিজ মোড়, স্টেশন রোড, কলেজ রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় ভর করে অদৃশ্য ভয়। চলন্ত অটোরিকশা, জনাকীর্ণ সড়ক কোথাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন (২৬) ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ঘুরতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দেন। দুই দিন পর তার লাশ উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করেন এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এর আগে ২৩ অক্টোবর দিঘারকান্দা-রহমতপুর বাইপাস সড়কে বাকপ্রতিবন্ধী অটোরিকশাচালক মাছুমকে ছুরিকাঘাত করে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটে। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় ১১১টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্তত ২০টি ছিনতাই-সংশ্লিষ্ট।

নগরীর বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রতি মাসে গড়ে এক হাজারের বেশি ছিনতাই হচ্ছে। কোতোয়ালি থানায় প্রতিদিন গড়ে ৮-১০টি অভিযোগ জমা পড়লেও অধিকাংশ ভুক্তভোগী আইনি জটিলতা ও হয়রানির আশঙ্কায় মামলা করেন না। পুলিশের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৬০টি; গ্রেফতার ৪৬৭ জন। তবে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।

মীরবাড়ি এলাকার শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান সজীব জানান, গত চার মাসে তিনি চারবার ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। টাঙ্গাইল পলিটেকনিকের ছাত্র রুবেল আহমেদ স্বাধীন বলেন, চলন্ত অটোরিকশায় যাত্রীবেশে উঠে দুর্বৃত্তরা তার মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ধোবাউড়া থেকে বেড়াতে এসে জয়নুল আবেদিন পার্ক এলাকায় একই অভিজ্ঞতার মুখে পড়েন আবু রায়হান। কেউই মামলা করেননি।

শম্ভুগঞ্জ, ব্রিজ মোড়, কেওটখালী, সানকিপাড়া, মীরবাড়ি, স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, গাঙ্গিনারপাড়, বাইপাস মোড় ও জয়নুল আবেদিন পার্কসহ অন্তত ১৫টি এলাকা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত। জেলার বাইরে থেকে পড়তে আসা কয়েক লাখ শিক্ষার্থীকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আটক আসামিদের বড় অংশ স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, সানকিপাড়া ও মীরবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। অনেকেই পেশাদার এবং জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছেন। আইনজীবীরা বলছেন, দণ্ডবিধির ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৯২ ও ৩৭৯ ধারায় মামলা হলেও দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষ্য-প্রমাণের জটিলতায় বিচার বিলম্বিত হয়।

সচেতন মহলের অভিযোগ, পুলিশের টহল প্রধান সড়কে সীমাবদ্ধ; অলিগলি ও অন্ধকার মোড়ে নজরদারি কম। গ্রেফতারদের বড় অংশ মাদকাসক্ত মাদকের উৎস বন্ধ না হলে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ কঠিন বলে মত তাদের।

নগরবাসীর দাবি, অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিভিল পোশাকে নজরদারি, আইএমইআই ট্র্যাকিং জোরদার, কার্যকর বিট পুলিশিং, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সিসিটিভি ও লাইভ মনিটরিং এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক। প্রশ্ন উঠেছে দৃশ্যমান ও কঠোর উদ্যোগ কবে দেখা যাবে? নইলে ছিনতাইয়ের এই আতঙ্কই হয়ে উঠবে নগরবাসীর দৈনন্দিন নিয়তি।