অস্তিত্বের দ্বিতীয় লিঙ্গ ও অবরোধবাসিনী

মুক্তিমন্ত্রের অভিন্ন স্বও : মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

Printed Edition
sahitto-1
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ , সিমোন দ্য বোভোয়ার

নারীমুক্তি ও ফেমিনিজমের ইতিহাসে কাল ও স্থানের ব্যবধান অনেক সময় দুটি ভিন্ন মেরুর চিন্তককেও এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে ফেলে। বিংশ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার এবং ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণের বাঙালি সমাজসস্কারক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন-এই দুই মহীয়সী নারীর অবস্থান ছিল ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে যোজন যোজন দূরে। একজন বেড়ে উঠেছেন পশ্চিমা আধুনিকতার তুঙ্গে থাকা প্যারিসে, অন্যজন ঔপনিবেশিক ভারতের রক্ষণশীল মুসলিম অন্দরমহলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নারীর পরাধীনতার শেকড় অনুসন্ধান এবং সেখান থেকে মুক্তির উপায় নির্দেশে তাদের দার্শনিক অবস্থান প্রায় একই সমতলে দণ্ডায়মান। সিমোন দ্য বোভোয়ার ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এ যে অস্তিত্ববাদী দর্শনের অবতারণা করেছেন, তার বহু আগেই বেগম রোকেয়া তার ‘মতিচূর’, ‘অবরোধবাসিনী’ ও ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ সেই একই দর্শনের প্রায়োগিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছিলেন। বোভোয়ারের দর্শনের আলোকে বেগম রোকেয়ার নারীমুক্তির চিন্তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা উভয়েই নারীকে ‘মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, যেখানে লিঙ্গপরিচয় ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে অস্তিত্বের স্বাধীনতা।

সিমোন দ্য বোভোয়ারের দর্শনের মূল ভিত্তি হলো অস্তিত্ববাদ, যার বিখ্যাত উক্তি- ‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, বরং ধীরে ধীরে তাকে নারী করে তোলা হয়।’ এই উক্তির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, নারীর অধস্তনতা প্রাকৃতিক বা জৈবিক নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ। সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য এবং পিতৃতান্ত্রিক প্রথা মিলে নারীকে পুরুষের সাপেক্ষে ‘অপর’ বা ‘দ্য আদার’ হিসেবে তৈরি করে। পুরুষের অস্তিত্ব যেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা ‘এসেনশিয়াল’, নারীর অস্তিত্ব সেখানে পুরুষের প্রয়োজনের নিরিখে সংজ্ঞায়িত-সে শুধুই ‘ইনএসেনশিয়াল’ বা অপ্রয়োজনীয় এক সত্তা, যতক্ষণ না সে পুরুষের সাথে যুক্ত হচ্ছে। বেগম রোকেয়ার চিন্তার জগৎ এই দর্শনের সাথে নিবিড়ভাবে মিলে যায়। রোকেয়া যখন বলেন, ‘আমরা সমাজেরই অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খুঁড়াইয়া খুঁড়াইয়া কতদূর চলিবে?’-তখন তিনি মূলত নারীকে পুরুষের সমান এবং সমাজের অপরিহার্য অংশ হিসেবেই দাবি করেন। কিন্তু রোকেয়া অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে লক্ষ্য করেছিলেন যে, সমাজ নারীকে মানুষ নয়, বরং পুরুষের অলংকার বা আসবাবপত্র হিসেবে ‘তৈরি’ করছে। বোভোয়ার যেমন বলেছেন নারীকে ‘তৈরি’ করা হয়, রোকেয়াও তেমনি তার ‘মতিচূর’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে শৈশব থেকে গহনা পরিয়ে, অন্দরমহলে বন্দী রেখে এবং শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে একটি মেয়েকে মানসিকভাবে পঙ্গু বা ‘নারী’তে রূপান্তর করা হয়। রোকেয়ার মতে, এই প্রক্রিয়াটি নারীকে ‘মানসিক দাসত্বে’ আবদ্ধ করে ফেলে, যা বোভোয়ারের ভাষায় নারীর ‘সাবজেক্ট’ বা কর্তা হয়ে ওঠার পথে প্রধান অন্তরায়।

বোভোয়ারের দর্শনে ‘অপরত্ব’ বা ‘আদারনেস’ একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। পুরুষ নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে ‘আমি’ বা ‘কর্তা’ হিসেবে, আর নারীকে দেখে ‘সে’ বা ‘বস্তু’ হিসেবে। এই বস্তু হয়ে ওঠার যন্ত্রণা বেগম রোকেয়ার লেখায় তীব্র শ্লেষের সাথে উঠে এসেছে। রোকেয়া দেখিয়েছেন যে, তৎকালীন বাঙালি মুসলিম সমাজে নারীর অবস্থান ছিল গৃহপালিত পশুপাখির চেয়ে খুব একটা উন্নত নয়। ‘অবরোধবাসিনী’ গ্রন্থে তিনি যে মর্মস্পর্শী ও হাস্যরসাত্মক ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন, তা আসলে নারীর ‘বস্তু’ হয়ে ওঠারই চরম দলিল। যেখানে একজন নারী নিজের জীবন বাঁচানোর চেয়ে পর্দা রক্ষা করাকে বা সমাজের আরোপিত নিয়ম পালনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেখানে তার নিজস্ব সত্তা বা ‘সেলফ’ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বোভোয়ার যুক্তি দেখান যে, পুরুষ নারীকে ‘ট্রান্সেন্ডেন্স’ বা নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে ‘ইমানেন্স’ বা স্থবিরতার মধ্যে আটকে রাখে। এই স্থবিরতা হলো ঘরের চার দেয়াল, রান্না আর প্রসাধন। রোকেয়া ঠিক এই জায়গাটিতেই আঘাত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নারীর জীবন কি কেবল পুতুল খেলা আর স্বামীর সেবা করার জন্য? রোকেয়া অনুধাবন করেছিলেন যে, এই স্থবিরতা নারীকে অকর্মণ্য করে তোলে। তাই তিনি লিখেছিলেন, ‘বলি, আমাদের এইরূপ দশা কেন? হেইরূপ অধঃপতন কেন? ইহার উত্তর-আমরা অকর্মণ্য পুতুল জীবন যাপন করি, তাই।’ এখানে ‘পুতুল’ শব্দটি বোভোয়ারের ‘বস্তু’ বা ‘অবজেক্ট’ ধারণারই সমার্থক।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সিমোন দ্য বোভোয়ার এবং বেগম রোকেয়া-উভয়ের দর্শনেই নারীমুক্তির প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত। বোভোয়ার স্পষ্টই বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নারী অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে কখনোই পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে না। অর্থনৈতিক মুক্তিই নারীকে তার নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার ক্ষমতা দেয়। বেগম রোকেয়া এই সত্যটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। বিশ শতকের শুরুর দিকে যখন নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়াই ছিল পাপ, তখন রোকেয়া নারীদের ‘কেরানি’, ‘জজ’, ‘ম্যাজিস্ট্রেট’ এমনকি ‘ভাইসরয়’ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, “আমরা উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? ... যে পরিশ্রম আমরা ‘স্বামী’র গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?” রোকেয়ার এই আহ্বান ছিল তৎকালীন সমাজের জন্য এক বৈপ্লবিক ঘোষণা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পেটের ভাতের জন্য যার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তার কাছে আত্মসম্মান দাবি করা বৃথা। বোভোয়ারের মতে, কাজ বা শ্রম নারীকে প্রকৃতির জগত থেকে ইতিহাসের জগতে নিয়ে আসে, তাকে সমাজ পরিবর্তনের অংশীদার করে। রোকেয়াও নারীকে কেবল গৃহকোণের শোভা না হয়ে সমাজের উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ কেবল অক্ষরজ্ঞান দানের কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি ছিল নারীকে স্বাবলম্বী ও কর্মক্ষম করে তোলার এক কারখানা।

নারীর ওপর ধর্মের অপব্যাখ্যা ও মিথের প্রভাব নিয়ে বোভোয়ার এবং রোকেয়া উভয়েই সোচ্চার ছিলেন। বোভোয়ার ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্ম এবং মিথলজি ব্যবহার করে পুরুষতন্ত্র নারীকে চিরকাল অধস্তন করে রেখেছে। কিছু ধর্মগ্রন্থে নারীকে পাপের উৎস বা পুরুষের সেবাদাসী হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতাকে বোভোয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন। বেগম রোকেয়াও তার সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে একই কথা বলেছেন, তবে তার ভাষা ছিল আরো প্রত্যক্ষ। তিনি বলেছিলেন, ‘পুরুষরা ধর্মের দোহাই দিয়া আমাদিগকে অন্ধকূপে রাখিয়াছেন।’ রোকেয়া লক্ষ্য করেছিলেন যে, ধর্মগ্রন্থের দোহাই দিয়ে নারীকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং তাকে খাঁচায় বন্দী করা হচ্ছে। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বা ‘সুলতানাস ড্রিম’-এ তিনি যে নারীবাদী ইউটোপিয়া বা কল্পরাজ্যের চিত্র এঁকেছেন, সেখানে তিনি প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক মিথগুলোকে উল্টে দিয়েছেন। সেখানে পুরুষরা থাকে অন্দরমহলে বা ‘মর্দানা’য়, আর নারীরা চালায় রাষ্ট্র। এই কল্পকাহিনীর মাধ্যমে রোকেয়া প্রমাণ করেছেন যে, বুদ্ধি বা সক্ষমতা লিঙ্গের ওপর নির্ভর করে না, বরং সুযোগ ও শিক্ষার ওপর নির্ভর করে। এটি বোভোয়ারের সেই তত্ত্বরই সাহিত্যিক রূপায়ণ যেখানে তিনি বলেন, নারী দুর্বল হয়ে জন্মায় না, তাকে দুর্বল করে রাখা হয়।

শিক্ষা-রোকেয়ার দর্শনের মূল স্তম্ভ, যা বোভোয়ারের সচেতনতা তৈরির ধারণার সাথে মিলে যায়। বোভোয়ারের মতে, নারী যখন নিজের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়, তখনই সে তার ‘ট্রান্সেন্ডেন্স’ বা উত্তরণের পথে যাত্রা শুরু করে। আর রোকেয়ার কাছে এই সচেতনতার একমাত্র বাহন হলো শিক্ষা। রোকেয়া আজীবন লড়াই করেছেন নারীশিক্ষার জন্য। তিনি জানতেন, অলঙ্কার বা দামী শাড়ি নারীকে মুক্তি দেবে না, মুক্তি দেবে জ্ঞান। তিনি বলেছিলেন, ‘শিক্ষাই আমাদের একমাত্র অবলম্বন।’ এই শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং এটি হলো আত্মোপলব্ধির শিক্ষা। রোকেয়া নারীদের শিখাতে চেয়েছিলেন যে তারা মানুষ এবং মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে। বোভোয়ার যেমন অস্তিত্ববাদী সঙ্কটের

সমাধানের জন্য নারীকে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন, রোকেয়াও তেমনি নারীকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য শিক্ষার অস্ত্র তুলে নিতে বলেছিলেন। রোকেয়ার নারীবাদ ছিল প্রাগম্যাটিক বা প্রায়োগিক। তিনি জানতেন, দার্শনিক তাত্ত্বিকতার চেয়ে বাংলার নারীদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করা বেশি জরুরি। কিন্তু তার এই কাজের পেছনে যে দর্শন ছিল, তা বোভোয়ারের মতোই গভীর ও সুদূরপ্রসারী।

রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ এবং বোভোয়ারের অস্তিত্ববাদী নারীবাদের মধ্যে একটি চমৎকার সংযোগ রয়েছে। বোভোয়ার চেয়েছিলেন এমন এক পৃথিবী যেখানে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক স্বীকৃতির (গঁঃঁধষ জবপড়মহরঃরড়হ)। কেউ কারও ‘অপর’ হবে না, বরং দুজনেই হবে স্বাধীন কর্তা। ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ রোকেয়া এমন এক জগত তৈরি করেছেন যেখানে বিজ্ঞান, যুক্তি ও প্রেম দিয়ে সমাজ পরিচালিত হয়। সেখানে পেশিশক্তির আস্ফালন নেই, যুদ্ধ নেই। রোকেয়া দেখিয়েছেন, নারীরা ক্ষমতায় গেলে পৃথিবীটা ধ্বংস হয় না, বরং আরো সুন্দর ও শান্তিময় হয়। এটি বোভোয়ারের সেই দাবিরই সমর্থন যে, নারীত্ব কোনো ঘাটতি নয়, বরং মানবসত্তারই এক ভিন্ন প্রকাশ। রোকেয়া তার লেখায় বারবার প্রমাণ করেছেন যে, পুরুষের তৈরি সমাজব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে কারণ সেখানে অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। তিনি যখন বলেন, ‘আমরা অকর্মণ্য পুতুল জীবন যাপন করি’, তখন তিনি আসলে নারীর সুপ্ত সম্ভাবনার কথাই স্মরণ করিয়ে দেন, যা বিকশিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।

সিমোন দ্য বোভোয়ার এবং বেগম রোকেয়ার চিন্তার তুলনা করলে দেখা যায়, তারা দুজনেই নারীকে শরীরসর্বস্ব অস্তিত্ব থেকে মুক্ত করে মননশীল সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। বোভোয়ারের দর্শন ছিল তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণধর্মী, যা পশ্চিমা দর্শনের বিবর্তনের ফসল। অন্যদিকে, রোকেয়ার দর্শন ছিল অভিজ্ঞতালব্ধ ও সংস্কারধর্মী, যা বাংলার রূঢ় বাস্তবতা থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু তাদের গন্তব্য ছিল এক। বোভোয়ার বলেছিলেন, নারীকে তার নিজের জীবনের ‘হিরো’ হতে হবে। রোকেয়াও চেয়েছিলেন বাংলার নারীরা যেন পরগাছা হয়ে না বাঁচে, তারা যেন নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে শেখে। রোকেয়ার নারীবাদ কেবল পুরুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল না, এটি ছিল নারীর নিজের জড়তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তিনি নারীকে আয়নায় নিজের দিকে তাকাতে বলেছিলেন, পুরুষের চোখে নয়। এটিই বোভোয়ারের ‘অথেনটিসিটি’ বা খাঁটি অস্তিত্বের ধারণা।

পরিশেষে বলা যায়, বেগম রোকেয়া সিমোন দ্য বোভোয়ারের জন্মের বহু আগেই পরাধীন ভারতের এক কোণে বসে যে চিন্তার মশাল জ্বালিয়েছিলেন, তা বিশ্বমানের নারীবাদী দর্শনের সমতুল্য। বোভোয়ারের লেন্স দিয়ে দেখলে রোকেয়াকে কেবল একজন সমাজসংস্কারক মনে হয় না, মনে হয় এক মগ্ন দার্শনিক যিনি অস্তিত্বের সঙ্কটকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, নারীর মুক্তি আকাশ থেকে পড়বে না, বা পুরুষ দয়া করে দিয়ে যাবে না। এই মুক্তি ছিনিয়ে আনতে হবে যোগ্যতা দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন দিয়ে। বোভোয়ার নারীকে শিখিয়েছেন নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করতে, আর রোকেয়া নারীকে শিখিয়েছেন সেই সংজ্ঞা বাস্তবে রূপ দিতে। তাদের ভাষা ভিন্ন ছিল, প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল, কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর ছিল অভিন্ন। সেই কণ্ঠস্বর আজও বিশ্বের প্রতিটি নিগৃহীত নারীকে মনে করিয়ে দেয়-সে ‘অপর’ নয়, সে নিজেই এক সম্পূর্ণ পৃথিবী; সে কেবল ‘নারী’ হয়ে জন্মায়নি, তাকে মানুষ হয়ে উঠতে হবে এবং সেই মানুষ হয়ে ওঠার সংগ্রামই হলো প্রকৃত মুক্তি।