এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রন্থাগার হচ্ছে জাবিতে
Printed Edition
আমির ফয়সাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
নির্মাণশিল্পের কোলাহল পেরিয়ে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রান্তরে পা রাখা যায়, তখন দূর থেকেই চোখে পড়ে এক নতুন স্বপ্নের আকৃতি। যেন ইট-সিমেন্টের নয়, জ্ঞান, নবীনতা আর ভবিষ্যতের আলোয় গড়া এক মহীরুহ ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন নতুন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার।
বহু বছর ধরে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকা আসন সঙ্কট, বইয়ের সীমাবদ্ধতা আর আধুনিক সুবিধাহীনতার ক্ষতচিহ্ন মুছে দিতে এই ভবন যেন নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসছে। যে বিশ্ববিদ্যালয় তার স্থাপত্যের সৌন্দর্য, সবুজের মোহ আর মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের জন্য দেশজোড়া পরিচিত, তার বুকেই এবার তৈরি হচ্ছে আধুনিকতম শিক্ষা ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার শুধু দেশের নয়, এশিয়ার মানচিত্রেও নিজেকে লিখে দিচ্ছে নতুন এক বিস্ময় হিসেবে। আয়তন ও ধারণক্ষমতার বিচারে এটি এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম, দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম বৃহত্তম, আর বাংলাদেশে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় ও নান্দনিক গ্রন্থাগার ভবন।
স্থাপত্যশিল্পের দিক থেকেও এটি এক অনন্য সৃষ্টিকর্ম। রোমান সাম্রাজ্যের মহিমাময় স্থাপত্য কলোসিয়াম যার বৃত্তাকার নকশা, স্তম্ভের ছন্দ আর খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালতার জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাত; জাহাঙ্গীরনগরের এই গ্রন্থাগার সেই
- ঐতিহাসিক স্থাপত্যভাবনার ছায়ায় গড়া এক আধুনিক প্রতিরূপ।
আড়াই লাখ বর্গফুট আয়তনের এই পাঁচতলা গ্রন্থাগার ভবন কেবল একটি ভবন নয়-এ যেন এক জ্ঞানের সমুদ্র, যেখানে এক সাথে পড়াশোনা করতে পারবে ছয় থেকে সাত হাজার শিক্ষার্থী। প্রকল্পের নকশায় যেমন উদ্ভাবনী ভাবনার ছাপ রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রয়োজনের সূক্ষ্মতম দিকগুলোরও যতœ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেফারেন্স বই, গবেষণা জার্নাল আর দুর্লভ প্রকাশনার সংগ্রহ একত্রে থাকবে এখানে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সুবিধাজনক ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য বিশেষ বইয়ের কর্নার সবটাই ভাবা হয়েছে অন্তর্ভুক্তির মর্ম থেকে।
এই ভবনের ভেতর প্রবেশ করলে পাঠক কেবল চেয়ার-টেবিল দেখবে না, বরং পাবেন এক সৃজনময় বিস্ময়ভূমি। অডিও-ভিজুয়াল সেন্টার, ভিডিও রেকর্ডিং স্টুডিও, ভিডিও রেফারেন্স সেকশন যেখানে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা-সামগ্রীর সাথে যুক্ত হতে পারবে। থাকবে আর্ট গ্যালারি, গ্রুপ ডিসকাশন রুম, সেমিনার-হল জ্ঞানচর্চা আর সৃজনশীলতার সমানতালে চলার জায়গা। আর আছে ক্লান্ত পাঠকের জন্য ক্যাফে, লাউঞ্জ ও ৩০টি বিশ্রামকক্ষ, যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দীর্ঘদিনের চাহিদা পূরণ করবে।
নিচতলায় কেন্দ্রীয় সার্ভিস বিভাগ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আর জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি প্রেস থাকবে। দ্বিতীয় তলায় সাজানো থাকবে পাঠ্যবই, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ এবং রেফারেন্স বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার। এখানে শিশু বিভাগ থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সংগ্রহও থাকবে। এমনকি থাকবে একটি ওপেন রিডিং স্পেস, যেখানে বসে খাবার খেতেও আপত্তি নেই।
তৃতীয় তলা গবেষকদের স্বর্গরাজ্য। গবেষণা পরামর্শ কক্ষ, সাহিত্য বিভাগ, ভিডিও রেফারেন্স সেকশন, যেখান থেকে বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ডিজিটাল প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে। আর থাকবে ডিজিটাল ম্যাপিং ও জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেমের জন্য বিশেষ ল্যাব। চতুর্থ তলা হবে আর্কাইভের আবাস, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, গবেষণাপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল আর সংস্কৃতির ভাণ্ডার।
এই গ্রন্থাগারের টেক জোন যেন ভবিষ্যতের সাথে সরাসরি সংযোগের জানালা। আন্তর্জাতিক লাইব্রেরি চ্যানেলে যুক্ত হয়ে বিশ্বের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেটাবেইস ঘেঁটে পড়তে পারবেন শিক্ষার্থীরা। এন্ডনোট, জোটেরো গবেষণায় অপরিহার্য এসব সফটওয়ার ব্যবহারের সুযোগ থাকবে সহজেই। উচ্চমানের অডিও-ভিডিও স্টুডিও, রেফারেন্স কিওস্ক, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি স্টুডিও সব মিলিয়ে এটি আর ১০টা লাইব্রেরির মতো নয়, বরং এক পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল জ্ঞানকেন্দ্র।
১৯৮৫ সালে শুরু হওয়া প্রথম গ্রন্থাগার ভবনের অপূর্ণতা যেন আজ নতুন করে পূরণ হতে চলেছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে, সেখানে ৪৪৭টি আসন বহু দিন ধরেই বাস্তবতার সাথে খাপ খায়নি। হলে রিডিং রুমের অভাব, গণরুমের ভিড়, আসন না পেয়ে ফিরে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আক্ষেপ, সব কিছুরই অবসান ঘটাতে আসছে এই নতুন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার।
সবুজের বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর এখন দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন শিক্ষাবিপ্লবের দোরগোড়ায়। নির্মাণাধীন গ্রন্থাগারটি কেবল ইট-সিমেন্টের কাঠামো নয়, এটি এক আলোকিত ভবিষ্যতের প্রতীক- যেখানে জ্ঞান, গবেষণা, সৃজনশীলতা আর প্রযুক্তি মিলেমিশে তৈরি করবে নতুন প্রজন্মের চিন্তার মহাকাশ।